Namer Ortho Bangla
নামাজ 29 November 2025

তারাবির নামাজ: নিয়ম, ফজিলত ও গুরুত্বপূর্ণ মাসায়েল

রমজান মাস আল্লাহ তাআলার বিশেষ রহমতের মাস। এই মাসে সিয়াম সাধনার পাশাপাশি তারাবির নামাজ আদায় করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারাবির নামাজ শুধু একটি ঐচ্ছিক ইবাদতই নয়, বরং এটি রমজানের আধ্যাত্মিক পরিবেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

তারাবির নামাজ কি?

‘তারাবি’ শব্দটি আরবি ‘তারবিহাতুন’ থেকে এসেছে, যার অর্থ বিশ্রাম করা বা আরাম করা। যেহেতু এই নামাজ দীর্ঘ সময় ধরে আদায় করা হয় এবং প্রতি চার রাকাত পর বিশ্রাম নেওয়ার বিধান রয়েছে, তাই একে তারাবির নামাজ বলা হয়। রমজান মাসে এশার নামাজের পর এবং বিতর নামাজের আগে এই নামাজ আদায় করা হয়।

তারাবির নামাজের তাৎপর্য

ইসলামে তারাবির নামাজের বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। এটি রমজান মাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত। হাদিসে এর অনেক ফজিলতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তারাবির নামাজ জামাতের সাথে আদায় করা উত্তম, তবে কেউ একা আদায় করলেও তা আদায় হয়ে যাবে।

তারাবির নামাজের নিয়ম

তারাবির নামাজ এশার ফরজ ও সুন্নতের পর আদায় করতে হয়। এর নিয়ম নিচে উল্লেখ করা হলো:

  • নিয়ত: প্রথমে তারাবির নামাজের জন্য নিয়ত করতে হয়। মনে মনে নিয়ত করাই যথেষ্ট। আরবিতে নিয়ত করা জরুরি নয়।
  • রাকাত সংখ্যা: তারাবির নামাজ সাধারণত ২০ রাকাত হয়ে থাকে। তবে রাকাত সংখ্যা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। কেউ ৮ রাকাতও আদায় করেন।
  • কেরাত: প্রত্যেক রাকাতে সূরা ফাতিহার পর অন্য যেকোনো সূরা বা সূরার অংশ তিলাওয়াত করতে হয়।
  • তাসবিহ: প্রতি চার রাকাত পর বিশ্রাম নেওয়া মুস্তাহাব। এই সময় কিছু তাসবিহ-তাহলিল পড়া যায়।
  • দোয়া: তারাবির নামাজের পর দোয়া করা মুস্তাহাব।

তারাবির নামাজের রাকাত সংখ্যা নিয়ে মতভেদ

তারাবির নামাজের রাকাত সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন মাজহাবে বিভিন্ন মত প্রচলিত আছে। হানাফি মাজহাব অনুযায়ী ২০ রাকাত তারাবির নামাজ আদায় করা সুন্নত। অন্যদিকে, কিছু আলেম ৮ রাকাত তারাবির নামাজ পড়ার কথাও বলেন। তবে অধিকাংশ উলামায়ে কেরাম ২০ রাকাতকেই সমর্থন করেন।

তারাবির নামাজের ফজিলত

তারাবির নামাজের ফজিলত অনেক। নিচে কয়েকটি ফজিলত উল্লেখ করা হলো:

  • গুনাহ মাফ: হাদিসে আছে, যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে সওয়াবের আশায় তারাবির নামাজ আদায় করে, তার পূর্বের গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়।
  • উচ্চ মর্যাদা: তারাবির নামাজ আদায়কারীর জন্য আল্লাহ তাআলা জান্নাতে উচ্চ মর্যাদা দান করেন।
  • রহমত ও বরকত: রমজান মাসে তারাবির নামাজের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার রহমত ও বরকত নাজিল হয়।
  • শয়তানের প্রভাব থেকে মুক্তি: তারাবির নামাজ আদায় করলে শয়তানের প্রভাব থেকে মুক্ত থাকা যায়।

তারাবির নামাজের গুরুত্বপূর্ণ মাসায়েল

তারাবির নামাজ সম্পর্কিত কিছু গুরুত্বপূর্ণ মাসায়েল নিচে আলোচনা করা হলো:

ইমামের জন্য তারাবির নামাজ

ইমামের জন্য তারাবির নামাজ জামাতে পড়ানো সুন্নত। তবে ইমামের উচিত মুসল্লিদের অবস্থার প্রতি লক্ষ্য রাখা এবং এমনভাবে নামাজ পড়ানো, যাতে কারো কষ্ট না হয়।

মহিলাদের জন্য তারাবির নামাজ

মহিলারা ঘরে একা তারাবির নামাজ আদায় করতে পারেন। মসজিদে গিয়ে জামাতে অংশ নেওয়া তাদের জন্য জরুরি নয়, তবে যদি তারা নিরাপদে যেতে পারেন তবে মসজিদে গিয়ে জামাতে অংশ নেওয়া ভালো।

মুসাফিরের জন্য তারাবির নামাজ

মুসাফির অবস্থায় তারাবির নামাজ পড়া জরুরি নয়। তবে সুযোগ থাকলে আদায় করে নেওয়া ভালো।

কাজা তারাবির নামাজ

যদি কারো তারাবির নামাজ ছুটে যায়, তবে তা কাজা করার বিধান নেই। এটি একটি নফল ইবাদত, যা নির্দিষ্ট সময়ে আদায় করতে হয়।

তারাবির নামাজ পড়ার নিয়ম (ধাপে ধাপে)

তারাবির নামাজ পড়ার নিয়ম নিচে ধাপে ধাপে দেওয়া হলো:

  1. এশার নামাজের ফরজ ও সুন্নত আদায় করার পর ইমাম সাহেব তারাবির নামাজের জন্য দাঁড়াবেন।
  2. প্রথমে তারাবির নামাজের নিয়ত করতে হবে।
  3. তারপর ইমাম সাহেব আল্লাহু আকবার বলে প্রথম রাকাত শুরু করবেন।
  4. প্রত্যেক রাকাতে সূরা ফাতিহা ও অন্য একটি সূরা অথবা সূরার কিছু অংশ তিলাওয়াত করবেন।
  5. সাধারণ নামাজের মতোই রুকু ও সিজদা করবেন।
  6. দুই রাকাত পর পর তাশাহুদ, দরুদ ও দোয়ায়ে মাসুরা পড়ে সালাম ফিরিয়ে নামাজ শেষ করবেন।
  7. প্রত্যেক চার রাকাত পর কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেওয়া মুস্তাহাব।
  8. বিশ রাকাত শেষ হওয়ার পর বিতর নামাজ আদায় করবেন।

কোরআন খতমের মাধ্যমে তারাবির নামাজ

রমজান মাসে তারাবির নামাজে সম্পূর্ণ কোরআন খতম করা মুস্তাহাব। এতে কোরআন তিলাওয়াতের ফজিলত অর্জিত হয় এবং মুসল্লিরা পুরো কোরআন শোনার সুযোগ পান। তবে কোরআন খতমের ক্ষেত্রে মুসল্লিদের কষ্টের বিষয়টিও খেয়াল রাখতে হবে। খুব দ্রুত তিলাওয়াত না করে ধীরে ধীরে স্পষ্ট করে তিলাওয়াত করা উচিত।

শেষকথা

তারাবির নামাজ রমজান মাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। এর মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার নৈকট্য লাভ করা যায় এবং গুনাহ মাফ হয়। তাই আমাদের সকলের উচিত রমজান মাসে তারাবির নামাজ গুরুত্বের সাথে আদায় করা এবং এর ফজিলত অর্জন করা। আল্লাহ আমাদের সকলকে তাওফিক দান করুন। আমিন।