Namer Ortho Bangla
নামাজ 29 November 2025

তাহাজ্জুদ নামাজের নিয়ত ও নিয়ম: সঠিক পদ্ধতি ও ফজিলত

তাহাজ্জুদ নামাজ অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ একটি নফল ইবাদত। রাতের নীরবতায় যখন সবাই গভীর ঘুমে মগ্ন থাকে, তখন আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় ঘুম থেকে জেগে নামাজ আদায় করা মুমিন বান্দাদের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য। এই নামাজ শুধু আল্লাহর নৈকট্যই এনে দেয় না, বরং এটি বান্দার আত্মশুদ্ধি ও মানসিক প্রশান্তিরও অন্যতম মাধ্যম।

তাহাজ্জুদ নামাজ কি?

তাহাজ্জুদ নামাজ হল ঐচ্ছিক নামাজ যা সাধারণত এশার নামাজের পর এবং ফজরের নামাজের আগে রাতের শেষ তৃতীয়াংশে আদায় করা হয়। এটি সুন্নতে মুয়াক্কাদা নয়, তবে এর ফজিলত অনেক বেশি। যারা নিয়মিত তাহাজ্জুদ পড়েন, আল্লাহ তাদের ভালোবাসেন এবং তাদের দোয়া কবুল করেন।

তাহাজ্জুদ নামাজের গুরুত্ব ও ফজিলত

কুরআন ও হাদিসে তাহাজ্জুদ নামাজের অনেক গুরুত্ব ও ফজিলতের কথা উল্লেখ আছে। নিচে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ফজিলত আলোচনা করা হলো:

  • আল্লাহর নৈকট্য লাভ: তাহাজ্জুদ নামাজ আল্লাহর সঙ্গে বান্দার সরাসরি সম্পর্ক স্থাপনে সাহায্য করে। রাতের নীরবতায় একাগ্রচিত্তে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করলে তিনি বান্দার ডাকে সাড়া দেন।
  • গুনাহ মাফ: নিয়মিত তাহাজ্জুদ পড়লে আল্লাহ বান্দার আগের গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেন।
  • দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ: তাহাজ্জুদ নামাজ আদায়কারীর জন্য দুনিয়া ও আখিরাতের জীবনে কল্যাণ ও সমৃদ্ধি অপেক্ষা করে।
  • মানসিক প্রশান্তি: রাতের নীরবতায় নামাজ পড়লে মন শান্ত হয় এবং দুশ্চিন্তা দূর হয়।
  • দোয়া কবুল: তাহাজ্জুদের সময় আল্লাহ বান্দার দোয়া কবুল করেন।
  • জান্নাত লাভ: যারা নিয়মিত তাহাজ্জুদ পড়েন, আল্লাহ তাদের জন্য জান্নাতে বিশেষ স্থান তৈরি করেন।

তাহাজ্জুদ নামাজের নিয়ত

তাহাজ্জুদ নামাজের জন্য আরবিতে নির্দিষ্ট কোনো নিয়ত নেই। তবে, মনে মনে এই নামাজের সংকল্প করাই যথেষ্ট। আরবিতে নিয়ত করতে চাইলে নিচের নিয়তটি করতে পারেন:

আরবি নিয়ত: নাওয়াইতু আন উসাল্লিয়া লিল্লাহি তা’আলা রাক’আতাই সালাতিত তাহাজ্জুদ, নাফ্‌লুন মুতাওয়াজ্জিহান ইলা জিহাতিল কা’বাতিশ শারীফাতি আল্লাহু আকবার।

বাংলা অর্থ: আমি ক্বিবলামুখী হয়ে আল্লাহর উদ্দেশ্যে দুই রাকাত তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করার নিয়ত করছি। আল্লাহু আকবার।

তবে, যদি আরবিতে নিয়ত করতে অসুবিধা হয়, তবে বাংলায় মনে মনে নিয়ত করাই যথেষ্ট। নিয়ত করা ফরজ নয়, এটি মনের ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল।

তাহাজ্জুদ নামাজের নিয়ম

তাহাজ্জুদ নামাজ অন্যান্য নফল নামাজের মতোই। নিচে তাহাজ্জুদ নামাজ আদায়ের নিয়মাবলী আলোচনা করা হলো:

১. প্রস্তুতি

প্রথমত, রাতে ঘুমানোর আগে তাহাজ্জুদ পড়ার নিয়ত করতে হবে। এরপর রাতে ঘুম থেকে উঠে ভালোভাবে অজু করতে হবে।

২. নামাজের শুরু

অজু করার পর ক্বিবলামুখী হয়ে দাঁড়ান। তারপর তাহাজ্জুদ নামাজের নিয়ত করুন।

৩. রাকাত সংখ্যা

তাহাজ্জুদ নামাজ সর্বনিম্ন দুই রাকাত এবং সর্বোচ্চ বারো রাকাত পর্যন্ত পড়া যায়। সাধারণত দুই রাকাত করে আদায় করাই উত্তম।

৪. নামাজ আদায়

সাধারণ নামাজের মতোই সূরা ফাতিহা ও অন্য যেকোনো সূরা মিলিয়ে রুকু ও সিজদার মাধ্যমে নামাজ আদায় করতে হয়। প্রথম রাকাতে সূরা ফাতিহার পর সূরা ইখলাস, সূরা নাস অথবা আপনার মুখস্থ থাকা যেকোনো সূরা পড়তে পারেন।

৫. দোয়া ও মোনাজাত

নামাজ শেষে আল্লাহর কাছে নিজের মনের desires গুলো তুলে ধরুন। নিজের জন্য, পরিবারের জন্য, এবং মুসলিম উম্মাহর জন্য দোয়া করুন। কান্নাকাটি করে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চান এবং সাহায্য প্রার্থনা করুন।

তাহাজ্জুদ নামাজের সময়

তাহাজ্জুদ নামাজ আদায়ের উত্তম সময় হলো রাতের শেষ তৃতীয়াংশ। অর্থাৎ, রাতের অর্ধেক পার হওয়ার পর থেকে ফজরের আজানের আগ পর্যন্ত এই নামাজ পড়া যায়। রাতের শেষ তৃতীয়াংশ বের করার নিয়ম হলো, সূর্যাস্তের পর থেকে ফজরের আগ পর্যন্ত সময়কে তিন ভাগে ভাগ করা। শেষ ভাগটিই হলো তাহাজ্জুদের উত্তম সময়।

তাহাজ্জুদ নামাজ কত রাকাত

তাহাজ্জুদ নামাজ সর্বনিম্ন ২ রাকাত এবং সর্বোচ্চ ১২ রাকাত পর্যন্ত পড়া যায়। তবে, বেশিরভাগ ইসলামিক পণ্ডিতদের মতে, ৮ রাকাত তাহাজ্জুদ আদায় করা উত্তম। আপনি আপনার সুবিধা অনুযায়ী রাকাত সংখ্যা নির্ধারণ করতে পারেন।

তাহাজ্জুদ নামাজে পঠিত সূরা

তাহাজ্জুদ নামাজে সুনির্দিষ্ট কোনো সূরা নেই। তবে, লম্বা কেরাত পড়া উত্তম। আপনি সূরা ফাতিহার পর কুরআন মাজিদের যেকোনো সূরা পড়তে পারেন। সূরা ইখলাস, সূরা ইয়াসিন, সূরা মুলক, সূরা ওয়াকিয়াহ ইত্যাদি সূরাগুলো সাধারণত এই নামাজে বেশি পড়া হয়।

তাহাজ্জুদ নামাজ কাজা হলে করণীয়

কোনো কারণে তাহাজ্জুদ নামাজ ছুটে গেলে, দিনের বেলায় তা কাজা হিসেবে আদায় করা যায়। যদি রাতে তাহাজ্জুদ পড়ার অভ্যাস থাকে, কিন্তু কোনোদিন পড়তে না পারেন, তবে পরের দিন ফজরের নামাজের পর থেকে দ্বিপ্রহরের পূর্ব পর্যন্ত কাজা আদায় করে নিতে পারেন।

কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়

  • নিয়মিত তাহাজ্জুদ পড়ার অভ্যাস করুন।
  • বিনয় ও একাগ্রতার সাথে নামাজ আদায় করুন।
  • আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করে দোয়া করুন।
  • পাপ কাজ থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে চলুন।
  • অন্যদেরকে তাহাজ্জুদ পড়ার জন্য উৎসাহিত করুন।

উপসংহার

তাহাজ্জুদ নামাজ আল্লাহর নৈকট্য লাভের এক অনন্য সুযোগ। তাই, আমাদের সকলের উচিত নিয়মিত এই নামাজ আদায় করার চেষ্টা করা এবং এর মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা। আল্লাহ আমাদের সকলকে তাহাজ্জুদ নামাজ পড়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।