Namer Ortho Bangla
নামাজ 29 November 2025

সালাতুল তাসবিহ নামাজ: নিয়ম, নিয়ত, ফজিলত ও বিস্তারিত

সালাতুল তাসবিহ নামাজ একটি বিশেষ নামাজ যা মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) উম্মতদের জন্য উপহারস্বরূপ দিয়েছেন। এটি একটি নফল ইবাদত, যা বান্দাকে আল্লাহ তাআলার আরও নিকটে নিয়ে যায় এবং অসংখ্য সওয়াব লাভের সুযোগ করে দেয়। এই নামাজে বিশেষ কিছু তাসবিহ পাঠ করা হয়, যা অন্যান্য নামাজ থেকে এটিকে স্বতন্ত্র করেছে।

সালাতুল তাসবিহ নামাজের ফজিলত

সালাতুল তাসবিহ নামাজের ফজিলত অপরিসীম। এই নামাজ পাঠের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা বান্দার জীবনের অনেক গুনাহ ক্ষমা করে দেন। হাদিসে বর্ণিত আছে, এই নামাজ নিয়মিত আদায় করলে পূর্বের এবং পরের, ছোট এবং বড়, গোপন এবং প্রকাশ্য সকল গুনাহ মাফ হয়ে যায়। এছাড়াও, এই নামাজ পাঠের মাধ্যমে অন্তরে প্রশান্তি আসে এবং আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা বৃদ্ধি পায়।

হাদিসের আলোকে সালাতুল তাসবিহ

হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর চাচা হযরত আব্বাস (রা.)-কে বলেছিলেন, “হে আব্বাস! আমি কি তোমাকে এমন একটি জিনিস দান করব না, যা তোমাকে আনন্দিত করবে? আমি কি তোমাকে এমন একটি আমল শিখিয়ে দেব না, যা করলে আল্লাহ তাআলা তোমার গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন? তা হল সালাতুল তাসবিহ।” (তিরমিযী, আবু দাউদ)

সালাতুল তাসবিহ নামাজের নিয়ম

সালাতুল তাসবিহ নামাজ চার রাকাআত বিশিষ্ট। এই নামাজে সূরা ফাতিহার সাথে অন্য যেকোনো সূরা মেলানো যায়। প্রতি রাকাআতে ৭৫ বার করে তাসবিহ পাঠ করতে হয়। নিচে এই নামাজের নিয়মাবলী বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:

তাসবিহ পড়ার নিয়ম

এই নামাজে যে তাসবিহটি পড়তে হয়, তা হলো: “সুবহানাল্লাহি ওয়াল হামদু লিল্লাহি ওয়া লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার।”

নামাজের রাকাতসমূহে তাসবিহ পড়ার নিয়ম

  1. প্রথম রাকাআতে সূরা ফাতিহা ও অন্য সূরা পড়ার পর দাঁড়ানো অবস্থায় ১৫ বার তাসবিহ পাঠ করতে হবে।
  2. এরপর রুকুতে গিয়ে রুকুর তাসবিহ পাঠ করার পর আরও ১০ বার উক্ত তাসবিহ পড়তে হবে।
  3. তারপর রুকু থেকে উঠে দাঁড়ানো অবস্থায় ১০ বার তাসবিহ পড়তে হবে।
  4. এরপর সিজদায় গিয়ে সিজদার তাসবিহ পাঠ করার পর আরও ১০ বার তাসবিহ পড়তে হবে।
  5. তারপর সিজদা থেকে উঠে বসে ১০ বার তাসবিহ পড়তে হবে।
  6. পুনরায় সিজদায় গিয়ে সিজদার তাসবিহ পাঠ করার পর আরও ১০ বার তাসবিহ পড়তে হবে।
  7. সিজদা থেকে উঠে পরবর্তী রাকাআতের জন্য দাঁড়ানোর পূর্বে ১০ বার তাসবিহ পড়তে হবে।

এভাবে প্রতি রাকাআতে ৭৫ বার এবং চার রাকাআতে মোট ৩০০ বার তাসবিহ পাঠ করতে হয়।

সালাতুল তাসবিহ নামাজের নিয়ত

সালাতুল তাসবিহ নামাজের জন্য বিশেষ কোনো আরবি নিয়ত নেই। সাধারণ নফল নামাজের মতোই নিয়ত করা যায়। তবে মনে মনে এই নামাজের সংকল্প করাই যথেষ্ট। উদাহরণস্বরূপ, এভাবে নিয়ত করা যেতে পারে:

“আমি কিবলামুখী হয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য চার রাকাআত সালাতুল তাসবিহ নামাজ আদায় করার নিয়ত করছি।”

সালাতুল তাসবিহ নামাজ পড়ার সময়

সালাতুল তাসবিহ নামাজ যেকোনো সময় আদায় করা যায়, তবে রাতের বেলা এই নামাজ আদায় করা উত্তম। এই নামাজ একা অথবা জামাতের সাথেও পড়া যায়। তবে একা পড়াই বেশি ভালো।

কোন সময়ে এই নামাজ পড়া নিষেধ?

সাধারণত নিষিদ্ধ সময়গুলোতে (যেমন সূর্যোদয়, সূর্যাস্ত এবং ঠিক দ্বিপ্রহরে) এই নামাজ পড়া উচিত নয়। এছাড়া অন্য যেকোনো সময় এই নামাজ আদায় করা যায়।

সালাতুল তাসবিহ নামাজ আদায়ের উপকারিতা

এই নামাজ আদায়ের মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর নৈকট্য লাভ করে এবং জীবনের গুনাহ থেকে মুক্তি পায়। এছাড়াও, এই নামাজ অন্তরের শান্তি ও প্রশান্তি বৃদ্ধি করে এবং আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসকে আরও দৃঢ় করে।

মানসিক প্রশান্তি ও আধ্যাত্মিক উন্নতি

সালাতুল তাসবিহ নামাজ শুধুমাত্র একটি ইবাদতই নয়, এটি মানসিক প্রশান্তি ও আধ্যাত্মিক উন্নতির একটি মাধ্যম। নিয়মিত এই নামাজ আদায় করলে মানুষ দুশ্চিন্তা ও হতাশা থেকে মুক্তি পায় এবং আল্লাহর প্রতি নির্ভরশীলতা বাড়ে।

সালাতুল তাসবিহ নামাজ নিয়ে কিছু প্রশ্ন ও উত্তর

এই নামাজ নিয়ে অনেকের মনে কিছু প্রশ্ন থাকে। নিচে কয়েকটি সাধারণ প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হলো:

প্রশ্ন: সালাতুল তাসবিহ নামাজ কি প্রতি দিন পড়া যায়?

উত্তর: হ্যাঁ, সালাতুল তাসবিহ নামাজ প্রতিদিন পড়া যায়। তবে সপ্তাহে একদিন অথবা মাসে একবার পড়লেও এর ফজিলত পাওয়া যায়।

প্রশ্ন: এই নামাজে কি সূরা ফাতেহা পড়া বাধ্যতামূলক?

উত্তর: হ্যাঁ, অন্যান্য নামাজের মতো এই নামাজেও সূরা ফাতেহা পড়া বাধ্যতামূলক।

প্রশ্ন: সালাতুল তাসবিহ নামাজে ভুল হলে কি করতে হবে?

উত্তর: যদি কোনো তাসবিহ পড়তে ভুল হয়ে যায়, তবে নামাজের শেষে সাহু সিজদা দিলে ভুল সংশোধন হয়ে যাবে।

উপসংহার

সালাতুল তাসবিহ নামাজ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নফল ইবাদত। এই নামাজ আদায় করে আমরা আমাদের জীবনের গুনাহ মাফ করিয়ে নিতে পারি এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভ করতে পারি। তাই আমাদের সকলের উচিত এই নামাজ নিয়মিত আদায় করার চেষ্টা করা। আল্লাহ আমাদের সকলকে তাওফিক দান করুন। আমিন।