পাইলস এর চিকিৎসা: ঔষধের নাম ও বিস্তারিত গাইড
সূচিপত্র
পাইলস কি?
পাইলস, যা হেমোরয়েড নামেও পরিচিত, একটি সাধারণ স্বাস্থ্য সমস্যা। এটি মলদ্বারের আশেপাশে এবং ভিতরের রক্তনালীগুলির ফোলাভাবের কারণে হয়ে থাকে। এই ফোলাভাবের কারণে রক্তনালীগুলো প্রসারিত হয়ে যায় এবং অস্বস্তি, ব্যথা ও রক্তপাতের মতো উপসর্গ দেখা দেয়।
পাইলস কেন হয়?
পাইলস হওয়ার পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে। নিচে কয়েকটি প্রধান কারণ উল্লেখ করা হলো:
- কোষ্ঠকাঠিন্য: দীর্ঘদিনের কোষ্ঠকাঠিন্য পাইলসের অন্যতম প্রধান কারণ। মলত্যাগের সময় অতিরিক্ত চাপ দেওয়ার কারণে রক্তনালীগুলোতে ফোলাভাব দেখা দেয়।
- গর্ভাবস্থা: গর্ভাবস্থায় জরায়ু বড় হওয়ার কারণে মলদ্বারের রক্তনালীগুলোর উপর চাপ পড়ে, যা পাইলসের ঝুঁকি বাড়ায়।
- অতিরিক্ত ওজন: অতিরিক্ত ওজন শরীরের বিভিন্ন অংশের উপর চাপ সৃষ্টি করে, যার ফলে পাইলস হতে পারে।
- বংশগত কারণ: পরিবারের কারো পাইলসের ইতিহাস থাকলে আপনারও এই রোগ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
- দীর্ঘ সময় ধরে বসে থাকা: যারা দীর্ঘ সময় ধরে বসে কাজ করেন, তাদের পাইলস হওয়ার ঝুঁকি বেশি।
- কম ফাইবারযুক্ত খাবার: খাবারে পর্যাপ্ত ফাইবার না থাকলে কোষ্ঠকাঠিন্য হতে পারে, যা পাইলসের কারণ।
পাইলসের লক্ষণ
পাইলসের লক্ষণগুলো ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে। কিছু সাধারণ লক্ষণ নিচে উল্লেখ করা হলো:
- মলত্যাগের সময় রক্তপাত: এটি পাইলসের সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণ। রক্ত সাধারণত উজ্জ্বল লাল রঙের হয়ে থাকে।
- মলদ্বারে ব্যথা ও অস্বস্তি: ফোলাভাব ও প্রদাহের কারণে মলদ্বারে ব্যথা ও অস্বস্তি হতে পারে।
- মলদ্বারের চারপাশে ফোলাভাব: মলদ্বারের আশেপাশে ফোলাভাব অনুভব করা যায়।
- চুলকানি: মলদ্বারের আশেপাশে চুলকানি হতে পারে।
- মলদ্বারের বাইরে মাংসপিণ্ড: মলদ্বারের বাইরে ছোট মাংসপিণ্ডের মতো অনুভব হতে পারে।
- বেদনাদায়ক মলত্যাগ: মলত্যাগ করার সময় ব্যথা অনুভব করা।
পাইলস এর চিকিৎসা: ঔষধের নাম
পাইলসের চিকিৎসায় বিভিন্ন ধরনের ঔষধ ব্যবহার করা হয়। ঔষধগুলো সাধারণত উপসর্গ উপশম এবং ফোলাভাব কমানোর জন্য ব্যবহার করা হয়। নিচে কিছু উল্লেখযোগ্য ঔষধের নাম ও ব্যবহারবিধি আলোচনা করা হলো:
১. মলম (Ointments)
মলম পাইলসের চিকিৎসায় বহুল ব্যবহৃত একটি ঔষধ। এটি সরাসরি মলদ্বারের আক্রান্ত স্থানে প্রয়োগ করা হয়। কিছু জনপ্রিয় মলম হলো:
- অ্যানুসল (Anusol): এটি মলদ্বারের ব্যথা, চুলকানি ও ফোলাভাব কমাতে সাহায্য করে।
- প্রোক্টোজেডিল (Proctosedyl): এটিতে লিডোকেইন (Lidocaine) নামক একটি উপাদান থাকে, যা ব্যথানাশক হিসেবে কাজ করে।
- শেরিং-প্লাস্ট (Scheriproct): এটি মলদ্বারের প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে।
ব্যবহারবিধি: মলম ব্যবহারের আগে মলদ্বার ভালোভাবে পরিষ্কার করে নিন। তারপর আক্রান্ত স্থানে মলম লাগান। সাধারণত দিনে ২-৩ বার ব্যবহার করা যায়, অথবা ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবহার করুন।
২. সাপোজিটরি (Suppositories)
সাপোজিটরি হলো এক ধরনের ঔষধ যা মলদ্বারের ভিতরে প্রবেশ করানো হয়। এটি মলদ্বারের ফোলাভাব ও ব্যথা কমাতে সাহায্য করে। কিছু পরিচিত সাপোজিটরি হলো:
- অ্যানুসল সাপোজিটরি (Anusol Suppositories): এটি মলদ্বারের ভিতরে প্রবেশ করিয়ে ব্যবহার করতে হয়।
- প্রোক্টোজেডিল সাপোজিটরি (Proctosedyl Suppositories): এটিও ব্যথানাশক হিসেবে কাজ করে এবং মলদ্বারের ফোলাভাব কমায়।
ব্যবহারবিধি: সাপোজিটরি ব্যবহারের আগে মলদ্বার পরিষ্কার করে নিন। তারপর সাপোজিটরিটি প্যাকেজের নির্দেশনা অনুযায়ী মলদ্বারের ভিতরে প্রবেশ করান। সাধারণত দিনে ১-২ বার ব্যবহার করা যায়।
৩. পেইন কিলার (Pain Killers)
পাইলসের কারণে তীব্র ব্যথা হলে পেইন কিলার ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে, এগুলো শুধুমাত্র সাময়িক উপশম দেয়। কিছু সাধারণ পেইন কিলার হলো:
- প্যারাসিটামল (Paracetamol): এটি হালকা থেকে মাঝারি ব্যথার জন্য ব্যবহার করা হয়।
- আইবুপ্রোফেন (Ibuprofen): এটি প্রদাহ কমাতে এবং ব্যথা নিবারণে সাহায্য করে।
ব্যবহারবিধি: পেইন কিলার ব্যবহারের আগে প্যাকেজের নির্দেশনা ভালোভাবে পড়ুন অথবা ডাক্তারের পরামর্শ নিন।
৪. ভেনোটনিক্স (Venotonics)
ভেনোটনিক্স হলো এমন ঔষধ যা রক্তনালীগুলোকে শক্তিশালী করতে সাহায্য করে এবং রক্ত চলাচল উন্নত করে। কিছু ভেনোটনিক্স ঔষধ হলো:
- ডায়োসমিন (Diosmin): এটি রক্তনালীগুলোর স্থিতিস্থাপকতা বাড়াতে সাহায্য করে।
- হেস্পেরিডিন (Hesperidin): এটিও রক্তনালীকে শক্তিশালী করে এবং প্রদাহ কমায়।
ব্যবহারবিধি: ভেনোটনিক্স ঔষধ ব্যবহারের আগে ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
৫. স্টেরয়েড ক্রিম (Steroid Creams)
কিছু ক্ষেত্রে, ডাক্তার স্টেরয়েড ক্রিম ব্যবহারের পরামর্শ দিতে পারেন। এই ক্রিমগুলো প্রদাহ কমাতে এবং চুলকানি উপশম করতে সাহায্য করে। তবে, স্টেরয়েড ক্রিম দীর্ঘকাল ব্যবহার করা উচিত নয়, কারণ এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকতে পারে।
পাইলসের ঘরোয়া চিকিৎসা
ঔষধের পাশাপাশি কিছু ঘরোয়া পদ্ধতি অনুসরণ করে পাইলসের উপসর্গ উপশম করা যেতে পারে। নিচে কয়েকটি ঘরোয়া উপায় আলোচনা করা হলো:
- ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার: খাদ্যতালিকায় প্রচুর পরিমাণে ফল, সবজি ও শস্য যোগ করুন। ফাইবার কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে সাহায্য করে।
- প্রচুর পানি পান করা: প্রতিদিন পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করুন, যা মল নরম করতে সাহায্য করে।
- সিটজ বাথ: দিনে কয়েকবার গরম পানিতে ১৫-২০ মিনিটের জন্য বসুন। এটি মলদ্বারের ব্যথা ও ফোলাভাব কমাতে সাহায্য করে।
- বরফ: আক্রান্ত স্থানে বরফ লাগালে ব্যথা ও ফোলাভাব কমতে পারে।
- অ্যালোভেরা: অ্যালোভেরা জেল মলদ্বারের চারপাশে লাগালে চুলকানি ও অস্বস্তি কম হতে পারে।
কখন ডাক্তার দেখাবেন?
যদি নিম্নলিখিত লক্ষণগুলো দেখা যায়, তাহলে দ্রুত ডাক্তার দেখানো উচিত:
- মলত্যাগের সময় অতিরিক্ত রক্তপাত।
- তীব্র ব্যথা যা ঔষধের মাধ্যমেও কমছে না।
- মলদ্বারের বাইরে মাংসপিণ্ড বেড়ে যাওয়া।
- জ্বর বা অন্য কোনো সংক্রমণের লক্ষণ দেখা দেওয়া।
পাইলস প্রতিরোধের উপায়
পাইলস প্রতিরোধের জন্য কিছু সহজ উপায় অনুসরণ করা যেতে পারে:
- নিয়মিত ব্যায়াম: ব্যায়াম শরীরের রক্ত চলাচল স্বাভাবিক রাখে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য প্রতিরোধ করে।
- স্বাস্থ্যকর খাবার: ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ করুন এবং প্রক্রিয়াজাত খাবার পরিহার করুন।
- সঠিক বসার ভঙ্গি: দীর্ঘ সময় ধরে বসে থাকার সময় কিছুক্ষণ পরপর বিরতি নিন।
- নিয়মিত মলত্যাগ: মলত্যাগের বেগ পেলে দেরি না করে দ্রুত সাড়া দিন।
সারসংক্ষেপ
পাইলস একটি সাধারণ রোগ হলেও সঠিক চিকিৎসা ও জীবনযাত্রার পরিবর্তনের মাধ্যমে এর থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। ঔষধের পাশাপাশি ঘরোয়া পদ্ধতি অনুসরণ করে এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে আপনি পাইলসের ঝুঁকি কমাতে পারেন। যদি উপসর্গ গুরুতর হয়, তাহলে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিন।