ইশার নামাজ কত রাকাত ও পড়ার নিয়ম – বিস্তারিত জেনেনিন
সূচিপত্র
ইসলামে প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য ফরজ। এই পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের মধ্যে ইশার নামাজ অন্যতম। ইশার নামাজ দিনের শেষ নামাজ হিসেবে বিবেচিত হয়। তাই এই নামাজের গুরুত্ব অনেক বেশি। অনেকেই ইশার নামাজ কত রাকাত এবং এর নিয়ম সম্পর্কে জানতে চান।
ইশার নামাজ কত রাকাত?
ইশার নামাজে মোট ৯ রাকাত আদায় করতে হয়। নিচে রাকাতগুলোর বিবরণ দেওয়া হলো:
- ফরজ: ৪ রাকাত
- সুন্নত: ২ রাকাত
- নফল: ২ রাকাত
- বিতর: ৩ রাকাত (ওয়াজিব)
সুতরাং, ইশার নামাজে প্রথমে ৪ রাকাত ফরজ আদায় করতে হয়, এরপর ২ রাকাত সুন্নত, ২ রাকাত নফল এবং সবশেষে ৩ রাকাত বিতর ওয়াজিব নামাজ আদায় করতে হয়।
ইশার নামাজের নিয়ম
ইশার নামাজ অন্যান্য নামাজের মতোই আদায় করতে হয়, তবে রাকাত সংখ্যায় ভিন্নতা রয়েছে। নিচে ইশার নামাজের নিয়ম ধাপে ধাপে আলোচনা করা হলো:
প্রথম ৪ রাকাত ফরজ নামাজ
- নিয়ত করা: প্রথমে কেবলামুখী হয়ে দাঁড়ান এবং মনে মনে ইশার ৪ রাকাত ফরজ নামাজের নিয়ত করুন। আরবিতে নিয়ত করতে না পারলে বাংলায়ও করতে পারেন।
- তাকবীরে তাহরিমা: “আল্লাহু আকবার” বলে হাত উঠিয়ে তাকবীরে তাহরিমা বাঁধুন। পুরুষরা কান পর্যন্ত এবং মহিলারা কাঁধ পর্যন্ত হাত উঠাবেন।
- সানা পড়া: তাকবীরে তাহরিমার পর ছানা পড়ুন: “সুবহানাকা আল্লাহুম্মা ওয়া বিহামদিকা ওয়া তাবারাকাসমুকা ওয়া তাআলা জাদ্দুকা ওয়া লা ইলাহা গাইরুকা।”
- সূরা ফাতিহা ও অন্য সূরা মিলানো: এরপর সূরা ফাতিহা পড়ুন এবং অন্য যেকোনো একটি সূরা অথবা সূরার কিছু অংশ তিলাওয়াত করুন।
- রুকু করা: “আল্লাহু আকবার” বলে রুকুতে যান এবং রুকুর তাসবিহ পড়ুন: “সুবহানা রাব্বিয়াল আজিম।” (কমপক্ষে তিনবার)।
- সোজা হয়ে দাঁড়ানো: রুকু থেকে উঠে সোজা হয়ে দাঁড়ান এবং বলুন: “সামি আল্লাহু লিমান হামিদাহ।”
- সিজদা করা: “আল্লাহু আকবার” বলে সিজদাতে যান এবং সিজদার তাসবিহ পড়ুন: “সুবহানা রাব্বিয়াল আলা।” (কমপক্ষে তিনবার)।
- বসা: সিজদা থেকে উঠে বসুন।
- দ্বিতীয় সিজদা: আবার সিজদাতে যান এবং সিজদার তাসবিহ পড়ুন।
- দাঁড়ানো: সিজদা থেকে উঠে দাঁড়ান। এভাবেই প্রথম রাকাত শেষ হলো।
- দ্বিতীয় রাকাত: প্রথম রাকাতের মতো করেই দ্বিতীয় রাকাত আদায় করুন। তবে এই রাকাতে ছানা পড়তে হবে না, সরাসরি সূরা ফাতিহা দিয়ে শুরু করবেন।
- আত্তাহিয়্যাতু, দরুদ ও দোয়া মাসুরা পড়া: দ্বিতীয় রাকাতের দ্বিতীয় সিজদার পর বসুন এবং আত্তাহিয়্যাতু, দরুদ শরীফ ও দোয়া মাসুরা পড়ুন।
- তৃতীয় রাকাত: “আল্লাহু আকবার” বলে দাঁড়িয়ে যান এবং শুধু সূরা ফাতিহা পড়ুন। এই রাকাতে অন্য কোনো সূরা মিলাতে হবে না। এরপর রুকু ও সিজদা করে তৃতীয় রাকাত শেষ করুন।
- চতুর্থ রাকাত: তৃতীয় রাকাতের মতো করেই চতুর্থ রাকাত আদায় করুন। এই রাকাতে সূরা ফাতিহার সাথে অন্য সূরা মিলাতে হবে না।
- সালাম ফেরানো: শেষ বৈঠকে আত্তাহিয়্যাতু, দরুদ শরীফ ও দোয়া মাসুরা পড়ে প্রথমে ডান দিকে এবং পরে বাম দিকে সালাম ফিরিয়ে নামাজ সম্পন্ন করুন।
২ রাকাত সুন্নত নামাজ
ফরজ নামাজের পর ২ রাকাত সুন্নত নামাজ আদায় করতে হয়। সুন্নত নামাজটিও ফরজ নামাজের মতোই, শুধু নিয়তের ক্ষেত্রে পার্থক্য রয়েছে।
- নিয়ত করা: ইশার ২ রাকাত সুন্নত নামাজের নিয়ত করুন।
- প্রথম রাকাত: সূরা ফাতিহা ও অন্য সূরা মিলিয়ে রুকু ও সিজদা করুন।
- দ্বিতীয় রাকাত: সূরা ফাতিহা ও অন্য সূরা মিলিয়ে রুকু ও সিজদা করুন।
- আত্তাহিয়্যাতু, দরুদ ও দোয়া মাসুরা পড়া: দ্বিতীয় রাকাতে আত্তাহিয়্যাতু, দরুদ শরীফ ও দোয়া মাসুরা পড়ে সালাম ফিরিয়ে নামাজ শেষ করুন।
২ রাকাত নফল নামাজ
সুন্নত নামাজের পর ২ রাকাত নফল নামাজ আদায় করা উত্তম। নফল নামাজ আদায় করা আবশ্যক নয়, তবে এটি আদায় করলে সাওয়াব পাওয়া যায়।
- নিয়ত করা: ইশার ২ রাকাত নফল নামাজের নিয়ত করুন।
- প্রথম রাকাত: সূরা ফাতিহা ও অন্য সূরা মিলিয়ে রুকু ও সিজদা করুন।
- দ্বিতীয় রাকাত: সূরা ফাতিহা ও অন্য সূরা মিলিয়ে রুকু ও সিজদা করুন।
- আত্তাহিয়্যাতু, দরুদ ও দোয়া মাসুরা পড়া: দ্বিতীয় রাকাতে আত্তাহিয়্যাতু, দরুদ শরীফ ও দোয়া মাসুরা পড়ে সালাম ফিরিয়ে নামাজ শেষ করুন।
৩ রাকাত বিতর ওয়াজিব নামাজ
ইশার নামাজের শেষে ৩ রাকাত বিতর ওয়াজিব নামাজ আদায় করতে হয়। বিতর নামাজ অন্য নামাজের থেকে একটু ভিন্ন।
- নিয়ত করা: বিতর নামাজের নিয়ত করুন।
- প্রথম রাকাত: সূরা ফাতিহা ও অন্য সূরা মিলিয়ে রুকু ও সিজদা করুন।
- দ্বিতীয় রাকাত: সূরা ফাতিহা ও অন্য সূরা মিলিয়ে রুকু ও সিজদা করুন।
- তৃতীয় রাকাত: তৃতীয় রাকাতে সূরা ফাতিহা ও অন্য সূরা মেলানোর পর রুকুতে যাওয়ার আগে অতিরিক্ত তাকবীর (তাকবীরে কুনুত) বলতে হয়। “আল্লাহু আকবার” বলে হাত উঠিয়ে কুনুতের দোয়া পড়তে হয়। যদি কুনুতের দোয়া মুখস্ত না থাকে, তবে অন্য কোনো দোয়া অথবা তিনবার “রাব্বিগফিরলী” পড়লেও চলবে।
- রুকু ও সিজদা: এরপর রুকু ও সিজদা করে শেষ বৈঠকে বসুন।
- সালাম ফেরানো: আত্তাহিয়্যাতু, দরুদ শরীফ ও দোয়া মাসুরা পড়ে সালাম ফিরিয়ে নামাজ শেষ করুন।
কুনুতের দোয়া
বিতর নামাজের তৃতীয় রাকাতে কুনুতের দোয়া পড়া ওয়াজিব। কুনুতের দোয়াটি হলো:
“আল্লাহুম্মা ইন্না নাস্তাঈনুকা ওয়া নাস্তাগফিরুকা, ওয়া নু’মিনু বিকা ওয়া নাতাওয়াক্কালু আলাইকা, ওয়া নুছনী আলাইকাল খাইর, নাশ কুরুকা ওয়া লা নাকফুরুকা, ওয়া নাখলাউ ওয়া নাতরুকু মাই ইয়াফজুরুকা। আল্লাহুম্মা ইয়্যাকানা’বুদু ওয়া লাকানুসল্লী ওয়া নাসজুদু, ওয়া ইলাইকা নাসয়া ওয়া নাহফিদু, নারজু রাহমাতাকা ওয়া নাখশা আজাবাকা, ইন্না আজাবাকা বিল কুফ্ফারি মুলহিক।”
যদি কুনুতের দোয়া মুখস্ত না থাকে, তবে এই দোয়াটি পড়তে পারেন:
“রাব্বিগফিরলী, রাব্বিগফিরলী, রাব্বিগফিরলী।”
ইশার নামাজের সময়
সূর্যাস্তের পর থেকে শুরু করে সুবহে সাদিক পর্যন্ত ইশার নামাজের সময় থাকে। সাধারণত, মাগরিবের নামাজের প্রায় দেড় ঘণ্টা পর ইশার নামাজের সময় শুরু হয়। তবে, স্থান ও সময়ের পার্থক্যের কারণে এই সময়ে কিছুটা ভিন্নতা দেখা যায়।
ইশার নামাজের গুরুত্ব
ইশার নামাজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি দিনের শেষ নামাজ এবং এর মাধ্যমে বান্দা মহান আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করে। ইশার নামাজ জামাতের সাথে আদায় করা উত্তম, এতে অনেক ফজিলত রয়েছে।
ইশার নামাজ কাজা হলে করণীয়
যদি কোনো কারণে ইশার নামাজ সময়মতো আদায় করা সম্ভব না হয়, তবে তা কাজা হিসেবে আদায় করে নিতে হবে। কাজা নামাজ আদায় করার নিয়ম হলো, যখনই সুযোগ পাওয়া যায়, তখন ইশার নামাজের নিয়ত করে ৪ রাকাত ফরজ, ২ রাকাত সুন্নত, ২ রাকাত নফল এবং ৩ রাকাত বিতর ওয়াজিব নামাজ আদায় করে নিতে হবে।
উপসংহার
ইশার নামাজ মুসলিমদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদত। এই নামাজ সঠিক নিয়মে আদায় করার মাধ্যমে আমরা আল্লাহর নৈকট্য লাভ করতে পারি এবং নিজেদের জীবনকে সুন্দর ও পরিশুদ্ধ করতে পারি। তাই, আমাদের সকলের উচিত ইশার নামাজ সময়মতো আদায় করার প্রতি যত্নবান হওয়া।