এশার নামাজ ৯ রাকাত কি কি? সঠিক নিয়ম ও মাসলা জেনে নিন
সূচিপত্র
এশার নামাজ মুসলিমদের জন্য দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের মধ্যে অন্যতম। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদত। অনেকেই এশার নামাজ কত রাকাআত এবং কীভাবে আদায় করতে হয়, তা নিয়ে বিভ্রান্তিতে ভোগেন। কেউ কেউ মনে করেন এশার নামাজ ৯ রাকাত, আবার কেউ ১৭ রাকাত মনে করেন। আজকের আর্টিকেলে আমরা এশার নামাজ ৯ রাকাত পড়ার বিধান এবং এর সঠিক নিয়ম সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করব।
এশার নামাজের রাকাত সংখ্যা: একটি সংক্ষিপ্ত আলোচনা
সাধারণভাবে, এশার নামাজ ১৭ রাকাত। এই ১৭ রাকাতের মধ্যে বিভিন্ন সুন্নত ও নফল নামাজ অন্তর্ভুক্ত। তবে, বিশেষ পরিস্থিতিতে বা ব্যক্তিগত কারণে কেউ চাইলে ৯ রাকাতও আদায় করতে পারেন। ৯ রাকাত কিভাবে আদায় করতে হয়, তা জানার আগে ১৭ রাকাতের বিভাজনটি দেখে নেওয়া যাক:
- ফরজ: ৪ রাকাত
- সুন্নত (মুয়াক্কাদা): ৪ রাকাত (ফরজের আগে)
- সুন্নত (গাইর মুয়াক্কাদা): ২ রাকাত (ফরজের পরে)
- বিতর: ৩ রাকাত
- নফল: ২ রাকাত
সুতরাং, সর্বমোট: ৪ + ৪ + ২ + ৩ + ২ = ১৭ রাকাত।
এশার নামাজ ৯ রাকাত কি কি?
এখন প্রশ্ন হলো, এশার নামাজ ৯ রাকাত কিভাবে পড়া যায়? ৯ রাকাতের মধ্যে ফরজ, বিতর এবং কিছু সুন্নত নামাজ অন্তর্ভুক্ত থাকে। নিচে এর বিভাজন দেওয়া হলো:
- ফরজ: ৪ রাকাত
- বিতর: ৩ রাকাত
- সুন্নত (মুয়াক্কাদা): ২ রাকাত (ফরজের আগে অথবা পরে)
সুতরাং, ৪ + ৩ + ২ = ৯ রাকাত।
৯ রাকাত নামাজ পড়ার নিয়ম
৯ রাকাত নামাজ পড়ার নিয়ম নিচে দেওয়া হলো:
- প্রথমে ৪ রাকাত ফরজ নামাজ আদায় করতে হবে।
- তারপর ২ রাকাত সুন্নত নামাজ আদায় করতে হবে। এই সুন্নত নামাজ ফরজের আগে অথবা পরেও পড়া যায়।
- সবশেষে ৩ রাকাত বিতর নামাজ আদায় করতে হবে।
এশার নামাজের রাকাতসমূহের বিস্তারিত নিয়ম
এশার নামাজের প্রতিটি রাকাতের নিয়ম জানা থাকা জরুরি। নিচে রাকাতগুলোর নিয়ম বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:
এশার ৪ রাকাত ফরজ নামাজ
এশার ফরজ নামাজ অন্যান্য ফরজ নামাজের মতোই আদায় করতে হয়। নিচে এর নিয়ম দেওয়া হলো:
- প্রথমে নিয়ত করতে হবে। আরবিতে অথবা বাংলায় মনে মনে নিয়ত করতে পারেন। যেমন: “আমি কেবলামুখী হয়ে এশার ৪ রাকাত ফরজ নামাজ আদায় করার নিয়ত করছি।”
- এরপর তাকবীরে তাহরিমা অর্থাৎ “আল্লাহু আকবার” বলে হাত বাঁধতে হবে।
- তারপর ছানা পড়তে হবে: “সুবহানাকা আল্লাহুম্মা ওয়া বিহামদিকা ওয়া তাবারাকাসমুকা ওয়া তাআলা জাদ্দুকা ওয়া লা ইলাহা গাইরুকা।”
- এরপর সূরা ফাতিহা এবং অন্য একটি সূরা (যেমন সূরা ইখলাস) পড়তে হবে।
- তারপর রুকুতে গিয়ে তাসবিহ পড়তে হবে: “সুবহানা রাব্বিয়াল আজিম” (কমপক্ষে তিনবার)।
- তারপর রুকু থেকে উঠে সোজা হয়ে দাঁড়াতে হবে।
- এরপর সিজদায় গিয়ে তাসবিহ পড়তে হবে: “সুবহানা রাব্বিয়াল আলা” (কমপক্ষে তিনবার)।
- প্রথম রাকাতের মতো দ্বিতীয় রাকাত আদায় করতে হবে।
- দ্বিতীয় রাকাতে তাশাহুদ পড়তে হবে: “আত্তাহিয়্যাতু লিল্লাহি ওয়াস সালাওয়াতু ওয়াত তাইয়িবাতু, আসসালামু আলাইকা আইয়্যুহান নাবিয়্যু ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু, আসসালামু আলাইনা ওয়া আলা ইবাদিল্লাহিস সালিহীন, আশহাদু আল লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসুলুহু।”
- এরপর তৃতীয় ও চতুর্থ রাকাত আদায় করতে হবে। এই দুই রাকাতে শুধু সূরা ফাতিহা পড়তে হয়, অন্য কোনো সূরা মেলানো লাগে না।
- চতুর্থ রাকাতের শেষে তাশাহুদ, দরুদ শরীফ এবং দোয়া মাসুরা পড়ে সালাম ফিরিয়ে নামাজ শেষ করতে হবে।
এশার ২ রাকাত সুন্নত নামাজ
এশার ২ রাকাত সুন্নত নামাজ ফরজ নামাজের মতোই আদায় করতে হয়। তবে, এই নামাজে প্রতি রাকাতে সূরা ফাতিহার সাথে অন্য একটি সূরা মেলানো সুন্নত।
এশার ৩ রাকাত বিতর নামাজ
বিতর নামাজ এশার নামাজের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ। বিতর নামাজ পড়ার নিয়ম নিচে দেওয়া হলো:
- প্রথম দুই রাকাত সাধারণ নামাজের মতোই আদায় করতে হবে।
- দ্বিতীয় রাকাতে তাশাহুদ পড়ার পর দাঁড়াতে হবে এবং সূরা ফাতিহার সাথে অন্য একটি সূরা মেলাতে হবে।
- এরপর কুনুতের দোয়া পড়তে হয়। কুনুতের দোয়াটি হলো: “আল্লাহুম্মা ইন্না নাস্তাঈনুকা ওয়া নাস্তাগফিরুকা, ওয়া নু’মিনু বিকা ওয়া নাতাওয়াক্কালু আলাইকা, ওয়া নুছনী আলাইকাল খাইর, নাশকুরুকা ওয়া লা নাকফুরুকা, ওয়া নাখলাউ ওয়া নাতরুকু মাই ইয়াফজুরুকা, আল্লাহুম্মা ইয়্যাকানা’বুদু ওয়া লাকানুসাল্লি ওয়া নাসজুদু, ওয়া ইলাইকা নাস’আ ওয়া নাহফিদু, নারজু রাহমাতাকা ওয়া নাখশা আজাবাকা, ইন্না আজাবাকা বিল কুফ্ফারি মুলহিক।”
- যদি কুনুতের দোয়া মুখস্ত না থাকে, তাহলে তিনবার “আল্লাহুম্মাগফিরলী” বললেও হবে।
- এরপর রুকু ও সিজদা করে সালাম ফিরিয়ে নামাজ শেষ করতে হবে।
এশার নামাজের গুরুত্ব ও ফজিলত
এশার নামাজ অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ একটি ইবাদত। কুরআন ও হাদিসে এশার নামাজের অনেক গুরুত্বের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। নিচে কয়েকটি ফজিলত উল্লেখ করা হলো:
- এশার নামাজ জামাতে আদায় করলে অর্ধেক রাত ইবাদতের সওয়াব পাওয়া যায়।
- এশার নামাজ মুনাফিকদের থেকে মুক্তি পাওয়ার অন্যতম উপায়।
- এশার নামাজ আদায় করলে আল্লাহ তাআলা বান্দার প্রতি সন্তুষ্ট হন।
- নিয়মিত এশার নামাজ আদায় করলে রিজিক বৃদ্ধি পায় এবং জীবনে বরকত আসে।
এশার নামাজ কখন পড়া উচিত?
এশার নামাজের ওয়াক্ত শুরু হয় মাগরিবের নামাজের শেষ হওয়ার পর থেকে এবং ফজর নামাজের আগ পর্যন্ত। তবে, রাতের প্রথম তৃতীয়াংশের মধ্যে এশার নামাজ আদায় করা উত্তম। বেশি দেরি করে নামাজ পড়া মাকরুহ।
কিছু জরুরি মাসলা
- যদি কেউ এশার ফরজ নামাজ জামাতে পড়তে না পারে, তাহলে একাকী আদায় করলেও নামাজ হয়ে যাবে।
- মহিলাদের জন্য ঘরে এশার নামাজ আদায় করা উত্তম।
- যদি কেউ অসুস্থ থাকে এবং দাঁড়িয়ে নামাজ পড়তে না পারে, তাহলে বসে বা শুয়ে নামাজ আদায় করতে পারবে।
- ভ্রমণের সময় মুসাফির ব্যক্তি ৪ রাকাত ফরজ নামাজকে ২ রাকাত হিসেবে আদায় করতে পারবে।
উপসংহার
এশার নামাজ মুসলিম উম্মাহর জন্য আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে একটি বিশেষ নিয়ামত। এই নামাজ সঠিকভাবে আদায় করার মাধ্যমে আমরা আল্লাহর নৈকট্য লাভ করতে পারি এবং নিজেদের জীবনকে সুন্দর ও সফল করতে পারি। এশার নামাজ ৯ রাকাত পড়ার বিধানও রয়েছে, তবে তা বিশেষ পরিস্থিতির জন্য প্রযোজ্য। আল্লাহ আমাদের সবাইকে সঠিকভাবে নামাজ আদায় করার তাওফিক দান করুন। আমিন।