Namer Ortho Bangla
নামাজ 29 November 2025

বিতর নামাজ পড়ার নিয়ম: সঠিক পদ্ধতি, দোয়া ও ফযিলত

বিতর নামাজ ওয়াজিব। এশার নামাজের পর বিতর নামাজ আদায় করা হয়। বিতর নামাজের গুরুত্ব অনেক। তাই আমাদের সকলেরই বিতর নামাজ পড়ার সঠিক নিয়ম জানা উচিত। এই আর্টিকেলে বিতর নামাজ পড়ার নিয়ম, দোয়া, ফযিলত এবং এই সম্পর্কিত বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর আলোচনা করা হলো।

বিতর নামাজ কি?

বিতর (وتر) একটি আরবি শব্দ। এর অর্থ হলো বেজোড়। বিতর নামাজ মানে হলো বেজোড় রাকাতের নামাজ। এটি মূলত তিন রাকাত বিশিষ্ট একটি নামাজ যা এশার ফরজ নামাজের পর আদায় করা হয়। হানাফি মাজহাব অনুসারে বিতর নামাজ ওয়াজিব।

বিতর নামাজের গুরুত্ব ও ফজিলত

বিতর নামাজের গুরুত্ব অপরিসীম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিতর নামাজকে খুব গুরুত্ব দিতেন এবং কখনো ছাড়তেন না। বিতর নামাজের ফজিলত সম্পর্কে কিছু হাদিস নিচে উল্লেখ করা হলো:

  • রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “আল্লাহ তাআলা তোমাদের জন্য একটি নামাজ বৃদ্ধি করেছেন, যা তোমাদের জন্য লাল উটের চেয়েও উত্তম। এটি হলো বিতর নামাজ। আল্লাহ তাআলা তোমাদের জন্য এ নামাজ এশার নামাজের পর থেকে ফজরের আগ পর্যন্ত রেখেছেন।” (আবু দাউদ, ১৪১৬)
  • অন্য এক হাদিসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “যে ব্যক্তি বিতর নামাজ আদায় করে না, সে আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়।” (মুসনাদে আহমাদ)
  • বিতর নামাজ রাতের শেষভাগে আদায় করা উত্তম। তবে কেউ যদি শেষ রাতে উঠতে না পারে, তবে এশার নামাজের পরেই আদায় করে নিতে পারে।

বিতর নামাজ পড়ার নিয়ম

বিতর নামাজ তিন রাকাত বিশিষ্ট। এই নামাজ পড়ার নিয়ম সাধারণ নামাজের মতোই, তবে কিছু বিশেষ নিয়ম রয়েছে। নিচে বিতর নামাজ পড়ার নিয়ম ধাপে ধাপে আলোচনা করা হলো:

প্রথম রাকাত

  1. প্রথমে বিতর নামাজ পড়ার নিয়ত করতে হবে। আরবিতে বা বাংলায় মনে মনে এই নিয়ত করা যায়: “আমি ক্বেবলামুখী হয়ে তিন রাকাত বিতর নামাজ আদায় করার নিয়ত করলাম।”
  2. এরপর তাকবীরে তাহরিমা অর্থাৎ “আল্লাহু আকবার” বলে হাত বাঁধতে হবে।
  3. তারপর ছানা পড়তে হবে: “সুবহানাকা আল্লাহুম্মা ওয়া বিহামদিকা ওয়া তাবারাকাসমুকা ওয়া তাআলা জাদ্দুকা ওয়া লা ইলাহা গাইরুকা।”
  4. এরপর সূরা ফাতিহা পড়তে হবে।
  5. সূরা ফাতিহা পড়া শেষ হলে অন্য যেকোনো একটি সূরা অথবা কুরআনের কিছু আয়াত তিলাওয়াত করতে হবে।
  6. তারপর রুকুতে যেতে হবে এবং রুকুর তাসবিহ পড়তে হবে: “সুবহানা রাব্বিয়াল আজিম” (কমপক্ষে তিনবার)।
  7. রুকু থেকে সোজা হয়ে দাঁড়াতে হবে এবং বলতে হবে: “সামিআল্লাহুলিমান হামিদাহ, রাব্বানা লাকাল হামদ।”
  8. এরপর সিজদাহ করতে হবে এবং সিজদার তাসবিহ পড়তে হবে: “সুবহানা রাব্বিয়াল আলা” (কমপক্ষে তিনবার)।
  9. প্রথম রাকাতের মতো দ্বিতীয় সিজদাহও আদায় করতে হবে।

দ্বিতীয় রাকাত

  1. সিজদাহ থেকে উঠে দাঁড়িয়ে দ্বিতীয় রাকাত শুরু করতে হবে।
  2. দ্বিতীয় রাকাতে সূরা ফাতিহা পড়তে হবে।
  3. সূরা ফাতিহা পড়া শেষ হলে অন্য যেকোনো একটি সূরা অথবা কুরআনের কিছু আয়াত তিলাওয়াত করতে হবে।
  4. তারপর রুকুতে যেতে হবে এবং রুকুর তাসবিহ পড়তে হবে: “সুবহানা রাব্বিয়াল আজিম” (কমপক্ষে তিনবার)।
  5. রুকু থেকে সোজা হয়ে দাঁড়াতে হবে এবং বলতে হবে: “সামিআল্লাহুলিমান হামিদাহ, রাব্বানা লাকাল হামদ।”
  6. এরপর সিজদাহ করতে হবে এবং সিজদার তাসবিহ পড়তে হবে: “সুবহানা রাব্বিয়াল আলা” (কমপক্ষে তিনবার)।
  7. দ্বিতীয় রাকাতের মতো দ্বিতীয় সিজদাহও আদায় করতে হবে।
  8. সিজদাহ থেকে উঠে বসতে হবে এবং তাশাহুদ (আত্তাহিয়্যাতু) পড়তে হবে।

তৃতীয় রাকাত

  1. তাশাহুদ পড়া শেষ করে দাঁড়িয়ে যেতে হবে।
  2. তৃতীয় রাকাতে প্রথমে সূরা ফাতিহা পড়তে হবে।
  3. সূরা ফাতিহা পড়া শেষ হলে অন্য যেকোনো একটি সূরা অথবা কুরআনের কিছু আয়াত তিলাওয়াত করতে হবে।
  4. এরপর রুকুতে যাওয়ার আগে তাকবীরে কুনুত বলতে হবে অর্থাৎ “আল্লাহু আকবার” বলে দু’হাত কান পর্যন্ত উঠিয়ে আবার ছেড়ে দিতে হবে এবং কুনুতের দোয়া পড়তে হবে।
  5. কুনুতের দোয়া পড়া শেষ হলে রুকুতে যেতে হবে এবং রুকুর তাসবিহ পড়তে হবে: “সুবহানা রাব্বিয়াল আজিম” (কমপক্ষে তিনবার)।
  6. রুকু থেকে সোজা হয়ে দাঁড়াতে হবে এবং বলতে হবে: “সামিআল্লাহুলিমান হামিদাহ, রাব্বানা লাকাল হামদ।”
  7. এরপর সিজদাহ করতে হবে এবং সিজদার তাসবিহ পড়তে হবে: “সুবহানা রাব্বিয়াল আলা” (কমপক্ষে তিনবার)।
  8. তৃতীয় রাকাতের মতো দ্বিতীয় সিজদাহও আদায় করতে হবে।
  9. সিজদাহ থেকে উঠে বসতে হবে এবং তাশাহুদ, দরুদ শরীফ ও দোয়া মাসুরা পড়ে সালাম ফিরিয়ে নামাজ শেষ করতে হবে।

কুনুতের দোয়া

বিতর নামাজের তৃতীয় রাকাতে রুকুতে যাওয়ার আগে কুনুতের দোয়া পড়তে হয়। কুনুতের দোয়া নিচে দেওয়া হলো:

আরবি:

اللَّهُمَّ إنا نَسْتَعِينُكَ وَنَسْتَغْفِرُكَ وَنُؤْمِنُ بِكَ وَنَتَوَكَّلُ عَلَيْكَ وَنُثْنِي عَلَيْكَ الْخَيْرَ كُلَّهُ نَشْكُرُكَ وَلَا نَكْفُرُكَ وَنَخْلَعُ وَنَتْرُكُ مَنْ يَفْجُرُكَ اللَّهُمَّ إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَلَكَ نُصَلِّي وَنَسْجُدُ وَإِلَيْكَ نَسْعَى وَنَحْفِدُ نَرْجُو رَحْمَتَكَ وَنَخْشَى عَذَابَكَ إِنَّ عَذَابَكَ بِالْكُفَّارِ مُلْحِقٌ

বাংলা উচ্চারণ:

আল্লাহুম্মা ইন্না নাসতাঈনুকা ওয়া নাসতাগফিরুকা, ওয়া নু’মিনু বিকা ওয়া নাতাওয়াক্কালু আলাইকা, ওয়া নুছনী আলাইকাল খাইরা কুল্লাহু, নাশকুরুকা ওয়া লা নাকফুরুকা, ওয়া নাখলাউ ওয়া নাতরুকু মাই ইয়াফজুরুকা। আল্লাহুম্মা ইয়্যাকানা’বুদু ওয়া লাকানুসল্লী ওয়া নাসজুদু ওয়া ইলাইকা নাস’য়া ওয়া নাহফিদু, নারজু রাহমাতাকা ওয়া নাখশা আযাবাকা, ইন্না আযাবাকা বিল কুফফারি মুলহিক।

অর্থ:

হে আল্লাহ! আমরা তোমার সাহায্য চাই, তোমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করি, তোমার প্রতি ঈমান রাখি, তোমার উপর ভরসা করি এবং তোমার গুণকীর্তন করি। আমরা তোমার কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করি এবং অকৃতজ্ঞ হই না। আমরা পরিত্যাগ করি এবং সম্পর্ক ছিন্ন করি তাদের সাথে যারা তোমার অবাধ্য। হে আল্লাহ! আমরা তোমারই ইবাদত করি, তোমার জন্য নামাজ পড়ি এবং তোমাকেই সিজদা করি। আমরা তোমার দিকে ধাবিত হই এবং তোমার সন্তুষ্টির জন্য সর্বদা প্রস্তুত থাকি। আমরা তোমার রহমতের আশা করি এবং তোমার শাস্তিকে ভয় করি। নিশ্চয়ই তোমার শাস্তি কাফেরদের জন্য নির্ধারিত।

কুনুতের দোয়া মুখস্থ না থাকলে কি করবেন?

যদি কারো কুনুতের দোয়া মুখস্থ না থাকে, তবে তিনি কুনুতের দোয়ার পরিবর্তে অন্য কোনো দোয়া অথবা কুরআনের কিছু আয়াত পড়তে পারেন। যেমন, তিনি এই দোয়াটি পড়তে পারেন:

আরবি:

رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ

বাংলা উচ্চারণ:

রাব্বানা আতিনা ফিদ্দুনইয়া হাসানাতাওঁ ওয়া ফিল আখিরাতি হাসানাতাওঁ ওয়াকিনা আযাবান্নার।

অর্থ:

হে আমাদের রব! আমাদেরকে দুনিয়াতে কল্যাণ দান করুন এবং আখিরাতে কল্যাণ দান করুন এবং আমাদেরকে আগুনের শাস্তি থেকে রক্ষা করুন। (সূরা আল-বাকারা, ২০১)

এছাড়াও, কেউ যদি কোনো দোয়া বা আয়াত কিছুই না জানে, তবে সে তিনবার “আল্লাহুম্মাগফিরলী” (হে আল্লাহ! আমাকে ক্ষমা করুন) বলতে পারে।

বিতর নামাজ কখন পড়তে হয়?

বিতর নামাজ এশার নামাজের পর থেকে শুরু করে ফজরের নামাজের আগ পর্যন্ত যেকোনো সময় পড়া যায়। তবে রাতের শেষভাগে অর্থাৎ সেহরীর আগে বিতর নামাজ পড়া উত্তম। যদি কেউ শেষ রাতে উঠতে না পারে, তবে এশার নামাজের পরপরই বিতর নামাজ আদায় করে নিতে পারে।

মহিলাদের বিতর নামাজ পড়ার নিয়ম

মহিলাদের বিতর নামাজ পড়ার নিয়ম পুরুষদের মতোই। তবে মহিলারা নামাজ পড়ার সময় তাদের হাত বুকের উপর বাঁধবেন এবং সিজদার সময় শরীর কিছুটা সংকুচিত করে রাখবেন। এছাড়া অন্য সকল নিয়ম একই থাকবে।

বিতর নামাজ সম্পর্কিত কিছু জরুরি মাসআলা

  • বিতর নামাজ একা পড়াই উত্তম, তবে জামাতের সাথে পড়াও জায়েজ।
  • রমজান মাসে তারাবীহ নামাজের পর জামাতের সাথে বিতর নামাজ পড়া উত্তম।
  • যদি কেউ বিতর নামাজ পড়তে ভুলে যায়, তবে তা কাজা করা ওয়াজিব।
  • বিতর নামাজে কুনুতের দোয়া পড়া ওয়াজিব।

উপসংহার

বিতর নামাজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদত। আমাদের সকলেরই উচিত এই নামাজ গুরুত্বের সাথে আদায় করা এবং এর নিয়মকানুন সম্পর্কে ভালোভাবে জানা। আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে বিতর নামাজ সঠিকভাবে আদায় করার তাওফিক দান করুন। আমিন।