বাচ্চাদের জিহ্বায় ঘা এর ঔষধ এর নাম ও ঘরোয়া প্রতিকার
বাচ্চাদের জিহ্বায় ঘা: কারণ, লক্ষণ ও ঔষধের নাম
বাচ্চাদের জিহ্বায় ঘা হওয়া একটি পরিচিত সমস্যা। এটি সাধারণত ছোট শিশুদের মধ্যে বেশি দেখা যায়, তবে যেকোনো বয়সের বাচ্চাদেরই এই সমস্যা হতে পারে। জিহ্বায় ঘা হলে বাচ্চা খেতে বা কথা বলতে অসুবিধা বোধ করে এবং কান্নাকাটি করতে পারে। সময় মতো চিকিৎসা না করালে এটি মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে। তাই, বাচ্চাদের জিহ্বায় ঘা হলে দ্রুত এর কারণ নির্ণয় করে সঠিক চিকিৎসা শুরু করা উচিত।
জিহ্বায় ঘা হওয়ার কারণ
বাচ্চাদের জিহ্বায় ঘা হওয়ার পেছনে বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। নিচে কয়েকটি প্রধান কারণ উল্লেখ করা হলো:
- ভাইরাস সংক্রমণ: কিছু ভাইরাস, যেমন Coxsackievirus (কক্সস্যাকিভাইরাস) এর কারণে হাতে, পায়ে ও মুখে ঘা হয় (Hand, Foot and Mouth Disease)। এটি জিহ্বাতেও হতে পারে।
- ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ: স্ট্রেপ্টোকক্কাস (Streptococcus) নামক ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণেও জিহ্বায় ঘা হতে পারে।
- ফাঙ্গাল সংক্রমণ: ক্যানডিডা (Candida) নামক ছত্রাকের সংক্রমণে মুখে সাদাটে ঘা হয়, যা থ্রাশ (Thrush) নামে পরিচিত।
- অপুষ্টি: ভিটামিন বি কমপ্লেক্স (Vitamin B complex) এবং আয়রনের অভাবে জিহ্বায় ঘা হতে পারে।
- দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা: দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সম্পন্ন বাচ্চাদের মধ্যে সংক্রমণ হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে।
- অ্যালার্জি: কিছু খাবার বা ওষুধের কারণে অ্যালার্জি হলে জিহ্বায় ঘা হতে পারে।
- মুখের অস্বাস্থ্যবিধি: মুখের স্বাস্থ্যবিধি ঠিকমতো না মানলে ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ হতে পারে এবং ঘা সৃষ্টি হতে পারে।
- রাসায়নিক উপাদান: কিছু টুথপেস্ট বা মাউথওয়াশে থাকা রাসায়নিক উপাদান থেকেও ঘা হতে পারে।
জিহ্বায় ঘা এর লক্ষণ
বাচ্চাদের জিহ্বায় ঘা হলে নিম্নলিখিত লক্ষণগুলো দেখা যেতে পারে:
- জিহ্বার উপর ছোট ছোট লাল বা সাদা ফোস্কা।
- ঘা এর চারপাশে লালচে ভাব।
- খাবার গিলতে বা কথা বলতে অসুবিধা।
- মুখের ভিতরে ব্যথা বা অস্বস্তি।
- অতিরিক্ত লালা নিঃসরণ।
- মেজাজ খিটখিটে হয়ে যাওয়া এবং কান্নাকাটি করা।
- খাবার খেতে অনীহা।
- হালকা জ্বর (সব ক্ষেত্রে নয়)।
বাচ্চাদের জিহ্বায় ঘা এর ঔষধ এর নাম
বাচ্চাদের জিহ্বায় ঘা এর চিকিৎসার জন্য বিভিন্ন ধরনের ঔষধ ব্যবহার করা হয়। তবে, ঔষধ ব্যবহারের আগে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে। নিচে কিছু সাধারণ ঔষধের নাম উল্লেখ করা হলো:
১. অ্যান্টিভাইরাল ঔষধ
ভাইরাস সংক্রমণের কারণে জিহ্বায় ঘা হলে অ্যান্টিভাইরাল ঔষধ ব্যবহার করা হয়। এক্ষেত্রে Acyclovir (অ্যাসাইক্লোভির) নামক ঔষধটি বহুল ব্যবহৃত। এটি ভাইরাসের বৃদ্ধি কমিয়ে ঘা সারাতে সাহায্য করে। ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী এই ঔষধ সিরাপ বা ট্যাবলেট আকারে দেওয়া যেতে পারে।
২. অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল ঔষধ
ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণের কারণে ঘা হলে অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল ঔষধ ব্যবহার করা হয়। এক্ষেত্রে Amoxicillin (অ্যামোক্সিসিলিন) অথবা Cephalexin (সেফালেক্সিন) জাতীয় ঔষধ ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে, অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী সঠিক ডোজ এবং সময়কালের জন্য ঔষধ খাওয়াতে হবে।
৩. অ্যান্টিফাঙ্গাল ঔষধ
ফাঙ্গাল সংক্রমণের কারণে জিহ্বায় ঘা হলে অ্যান্টিফাঙ্গাল ঔষধ ব্যবহার করা হয়। Nystatin (নিস্ট্যাটিন) নামক একটি অ্যান্টিফাঙ্গাল ড্রপ শিশুদের জন্য খুবই উপযোগী। এটি মুখের মধ্যে লাগাতে হয় এবং দিনে কয়েকবার ব্যবহার করতে হয়।
৪. ব্যথানাশক ঔষধ
ঘা এর কারণে বাচ্চা ব্যথা অনুভব করলে ব্যথানাশক ঔষধ দেওয়া যেতে পারে। এক্ষেত্রে প্যারাসিটামল (Paracetamol) বা আইবুপ্রোফেন (Ibuprofen) জাতীয় ঔষধ ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে, মনে রাখতে হবে শিশুদের জন্য ঔষধের ডোজ তাদের ওজন ও বয়সের উপর নির্ভর করে।
৫. ভিটামিন সাপ্লিমেন্ট
ভিটামিন বি কমপ্লেক্স (Vitamin B complex) এবং আয়রনের অভাবে জিহ্বায় ঘা হলে এই ভিটামিনগুলোর সাপ্লিমেন্ট দেওয়া যেতে পারে। এটি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে এবং ঘা দ্রুত সারিয়ে তোলে।
৬. মাউথওয়াশ
ক্লোরহেক্সিডিন (Chlorhexidine) সমৃদ্ধ মাউথওয়াশ ব্যবহার করলে মুখের জীবাণু কমে যায় এবং ঘা দ্রুত সেরে যায়। তবে, ছোট বাচ্চাদের ক্ষেত্রে এটি ব্যবহার করার আগে ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
জিহ্বায় ঘা এর ঘরোয়া প্রতিকার
ঔষধের পাশাপাশি কিছু ঘরোয়া উপায় অবলম্বন করে বাচ্চাদের জিহ্বার ঘা উপশম করা যেতে পারে। নিচে কয়েকটি ঘরোয়া প্রতিকার আলোচনা করা হলো:
১. লবণ পানি
হালকা গরম পানিতে লবণ মিশিয়ে দিনে কয়েকবার গার্গল করলে ঘা দ্রুত সেরে যায়। লবণ পানি মুখের জীবাণু ধ্বংস করে এবং ব্যথা কমাতে সাহায্য করে।
২. মধু
মধুতে অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল এবং অ্যান্টিইনফ্লেমেটরি উপাদান রয়েছে। এটি ঘা এর উপর লাগালে ব্যথা কমে এবং দ্রুত সেরে যায়। তবে, এক বছরের কম বয়সী বাচ্চাদের মধু দেওয়া উচিত নয়।
৩. নারকেল তেল
নারকেল তেলে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল উপাদান রয়েছে। এটি ঘা এর উপর লাগালে সংক্রমণ কম হয় এবং আরাম পাওয়া যায়।
৪. অ্যালোভেরা জেল
অ্যালোভেরা জেলে অ্যান্টিইনফ্লেমেটরি এবং ব্যথানাশক উপাদান রয়েছে। এটি ঘা এর উপর লাগালে ফোলা এবং ব্যথা কমে যায়।
৫. ঠান্ডা খাবার
ঠান্ডা খাবার, যেমন আইসক্রিম বা দই, বাচ্চাদের জিহ্বার ঘা এর ব্যথা কমাতে সাহায্য করে।
৬. নরম খাবার
ঘা যতদিন না সারে ততদিন বাচ্চাদের নরম খাবার দেওয়া উচিত, যা গিলতে সহজ হয়। ঝাল বা মশলাযুক্ত খাবার এড়িয়ে যাওয়া ভালো।
করণীয় ও বর্জনীয়
বাচ্চাদের জিহ্বায় ঘা হলে কিছু বিষয় মনে রাখা উচিত। নিচে করণীয় ও বর্জনীয় বিষয়গুলো উল্লেখ করা হলো:
করণীয়
- নিয়মিত মুখের স্বাস্থ্যবিধি বজায় রাখা।
- নরম টুথব্রাশ ব্যবহার করা।
- প্রচুর পরিমাণে পানি পান করানো।
- ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ঔষধ ব্যবহার করা।
- সংক্রমণ ছড়ানো এড়াতে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকা।
বর্জনীয়
- ঝাল, মশলাযুক্ত এবং অ্যাসিডিক খাবার পরিহার করা।
- অতিরিক্ত গরম খাবার বা পানীয় পরিহার করা।
- জোর করে খাবার খাওয়ানো থেকে বিরত থাকা।
- ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া কোনো ঔষধ ব্যবহার না করা।
কখন ডাক্তার দেখাবেন?
সাধারণত ঘরোয়া চিকিৎসায় জিহ্বার ঘা সেরে যায়। তবে, নিম্নলিখিত সমস্যাগুলো দেখা দিলে দ্রুত ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত:
- ঘা যদি দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে থাকে।
- ঘা থেকে রক্তপাত হলে।
- জ্বর বা অন্য কোনো উপসর্গ দেখা দিলে।
- খাবার গিলতে খুব বেশি অসুবিধা হলে।
- বাচ্চার শ্বাস নিতে কষ্ট হলে।
প্রতিরোধ
কিছু সাধারণ সতর্কতা অবলম্বন করে বাচ্চাদের জিহ্বায় ঘা হওয়া প্রতিরোধ করা যেতে পারে:
- শিশুদের নিয়মিত দাঁত ব্রাশ করার অভ্যাস তৈরি করুন।
- খাবার আগে ও পরে হাত ধোয়ার অভ্যাস তৈরি করুন।
- শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য পুষ্টিকর খাবার দিন।
- শিশুদের পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করান।
- ভাইরাস সংক্রমণ এড়াতে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকুন।
বাচ্চাদের জিহ্বায় ঘা একটি সাধারণ সমস্যা হলেও সঠিক সময়ে চিকিৎসা না করালে এটি জটিল আকার ধারণ করতে পারে। তাই, অভিভাবকদের উচিত বাচ্চাদের মুখের স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং কোনো সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া।