জোহরের নামাজ কত রাকাত? নিয়ম, ওয়াক্ত ও ফজিলত জানুন
সূচিপত্র
ইসলামে জোহরের নামাজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজের মধ্যে দ্বিতীয়। প্রত্যেক মুসলিমের জন্য এটি আদায় করা আবশ্যক। জোহরের নামাজ আদায় করার সঠিক নিয়ম, রাকাত সংখ্যা এবং এর ফজিলত সম্পর্কে জানা জরুরি। এই আর্টিকেলে জোহরের নামাজ কত রাকাত, কখন পড়তে হয় এবং এর তাৎপর্য নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
জোহরের নামাজ কত রাকাত?
জোহরের নামাজ মোট ১২ রাকাত। এর মধ্যে ৪ রাকাত সুন্নত, ৪ রাকাত ফরজ, ২ রাকাত সুন্নত এবং ২ রাকাত নফল। নিচে রাকাতগুলোর বিভাজন দেওয়া হলো:
- প্রথম ৪ রাকাত: সুন্নত (যা আদায় করা মুস্তাহাব)
- পরের ৪ রাকাত: ফরজ (যা আদায় করা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য আবশ্যক)
- তারপর ২ রাকাত: সুন্নত (যা আদায় করা মুস্তাহাব)
- শেষ ২ রাকাত: নফল (যা আদায় করলে সাওয়াব পাওয়া যায়)
সুতরাং, জোহরের নামাজে মোট ১২ রাকাত আদায় করতে হয়। ফরজ নামাজ অবশ্যই আদায় করতে হবে, তবে সুন্নত ও নফল নামাজ আদায় করা উত্তম।
জোহরের নামাজের রাকাতসমূহের বিস্তারিত বিবরণ
জোহরের নামাজের রাকাতগুলোর আরও বিস্তারিত বিবরণ নিচে দেওয়া হলো:
- প্রথম ৪ রাকাত সুন্নত: এই ৪ রাকাত সুন্নত নামাজের নিয়ত করে সাধারণ নিয়মে আদায় করতে হয়। প্রথম রাকাতে সূরা ফাতিহার পর অন্য একটি সূরা মিলিয়ে পড়তে হয়।
- পরের ৪ রাকাত ফরজ: এই ৪ রাকাত ফরজ নামাজ ইমামের সাথে জামাতে আদায় করা উত্তম। যদি জামাত সম্ভব না হয়, তবে একাকীও আদায় করা যায়। ফরজ নামাজে সূরা ফাতিহা পড়া আবশ্যক।
- তারপর ২ রাকাত সুন্নত: ফরজ নামাজের পর এই ২ রাকাত সুন্নত নামাজ আদায় করতে হয়। এটিও সূরা ফাতিহা ও অন্য সূরা মিলিয়ে পড়তে হয়।
- শেষ ২ রাকাত নফল: এই ২ রাকাত নফল নামাজ অতিরিক্ত সাওয়াব লাভের উদ্দেশ্যে আদায় করা হয়। নফল নামাজ আদায় করা বাধ্যতামূলক নয়, তবে এটি আদায় করলে আল্লাহ্র সন্তুষ্টি লাভ করা যায়।
জোহরের নামাজের ওয়াক্ত
জোহরের নামাজের ওয়াক্ত শুরু হয় দ্বিপ্রহরের পর, অর্থাৎ সূর্য যখন ঠিক মাথার উপর থেকে পশ্চিম দিকে একটু হেলে যায়। সাধারণত, সূর্য মধ্যাকাশ অতিক্রম করার প্রায় ৫-১০ মিনিট পর জোহরের ওয়াক্ত শুরু হয়। এই নামাজের ওয়াক্ত আসরের নামাজের আগ পর্যন্ত থাকে। তবে, আসরের নামাজ শুরু হওয়ার পূর্বে জোহরের নামাজ আদায় করা উত্তম।
জোহরের নামাজের সময়সূচি
জোহরের নামাজের সময়সূচি সাধারণত স্থানীয় মসজিদের ক্যালেন্ডার বা ইসলামিক ওয়েবসাইট থেকে জানা যায়। আধুনিক যুগে বিভিন্ন মোবাইল অ্যাপ্লিকেশনের মাধ্যমেও নামাজের সঠিক সময় জানা যায়। জোহরের নামাজের ওয়াক্ত শুরু হওয়ার সাথে সাথেই নামাজ আদায় করা উত্তম, তবে কোনো কারণে দেরি হলে আসরের ওয়াক্ত শুরু হওয়ার আগেই আদায় করে নেওয়া উচিত।
জোহরের নামাজের নিয়ম
জোহরের নামাজ অন্যান্য নামাজের মতোই আদায় করতে হয়। নিচে জোহরের নামাজ আদায়ের নিয়মগুলো ধাপে ধাপে আলোচনা করা হলো:
- নিয়ত করা: প্রথমে জোহরের নামাজের জন্য মনে মনে নিয়ত করতে হবে। আরবিতে নিয়ত করা জরুরি নয়, বাংলায়ও নিয়ত করা যায়। যেমন: “আমি জোহরের ৪ রাকাত ফরজ নামাজ কিবলামুখী হয়ে আদায় করছি।”
- তাকবীরে তাহরিমা: এরপর “আল্লাহু আকবার” বলে হাত বাঁধতে হয়। পুরুষরা সাধারণত নাভির নিচে এবং মহিলারা বুকের উপর হাত বাঁধেন।
- সানা পড়া: হাত বাঁধার পর সানা পড়তে হয়: “সুবহানাকা আল্লাহুম্মা ওয়া বিহামদিকা ওয়া তাবারাকাসমুকা ওয়া তায়ালা জাদ্দুকা ওয়া লা ইলাহা গাইরুকা।”
- সূরা ফাতিহা ও অন্য সূরা মিলানো: এরপর সূরা ফাতিহা পড়তে হয় এবং তারপর কুরআনের অন্য যেকোনো একটি সূরা মিলিয়ে পড়তে হয়।
- রুকু করা: সূরা পড়া শেষ হলে “আল্লাহু আকবার” বলে রুকুতে যেতে হয়। রুকুতে গিয়ে তিনবার “সুবহানা রাব্বিয়াল আজিম” পড়তে হয়।
- সিজদা করা: রুকু থেকে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে “আল্লাহু আকবার” বলে সিজদায় যেতে হয়। সিজদায় গিয়ে তিনবার “সুবহানা রাব্বিয়াল আলা” পড়তে হয়।
- বৈঠকে বসা: প্রথম সিজদা থেকে উঠে কিছুক্ষণ বসে দ্বিতীয় সিজদা করতে হয়। দ্বিতীয় সিজদাতেও তিনবার “সুবহানা রাব্বিয়াল আলা” পড়তে হয়।
- দ্বিতীয় রাকাত আদায়: এরপর দ্বিতীয় রাকাতের জন্য উঠে দাঁড়াতে হয় এবং প্রথম রাকাতের মতো করেই সূরা ফাতিহা ও অন্য সূরা মিলিয়ে রুকু ও সিজদা করতে হয়।
- আত্তাহিয়াতু, দরুদ ও দোয়া পড়া: দ্বিতীয় রাকাতের শেষে বৈঠকে বসে আত্তাহিয়াতু, দরুদ ও দোয়া মাসুরা পড়তে হয়।
- সালাম ফেরানো: এরপর ডানে ও বামে সালাম ফিরিয়ে নামাজ শেষ করতে হয়।
জোহরের নামাজের ফজিলত
জোহরের নামাজের অনেক ফজিলত রয়েছে। নিচে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ফজিলত আলোচনা করা হলো:
- গুনাহ মাফ: নিয়মিত জোহরের নামাজ আদায় করলে আল্লাহ্ বান্দার গুনাহ মাফ করে দেন।
- মানসিক শান্তি: জোহরের নামাজ আদায় করলে মন শান্ত থাকে এবং দুশ্চিন্তা দূর হয়।
- আল্লাহ্র সন্তুষ্টি: নিয়মিত নামাজ আদায় করলে আল্লাহ্ বান্দার উপর সন্তুষ্ট হন এবং তার প্রতি রহমত বর্ষণ করেন।
- সওয়াব লাভ: প্রত্যেক রাকাত নামাজের জন্য আল্লাহ্ তা’আলা বান্দাকে অগণিত সওয়াব দান করেন।
- জান্নাত লাভ: নিয়মিত নামাজ আদায়কারী ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে।
জোহরের নামাজ জামাতে আদায়ের গুরুত্ব
জোহরের নামাজ জামাতে আদায় করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। জামাতে নামাজ আদায় করলে অনেক বেশি সওয়াব পাওয়া যায়। জামাতে নামাজ আদায় করার কিছু বিশেষ গুরুত্ব নিচে উল্লেখ করা হলো:
- ২৭ গুণ বেশি সওয়াব: একা নামাজ আদায়ের চেয়ে জামাতে নামাজ আদায় করলে ২৭ গুণ বেশি সওয়াব পাওয়া যায়।
- ঐক্যবদ্ধতা: জামাতে নামাজ আদায় করলে মুসলিমদের মধ্যে ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ববোধ সৃষ্টি হয়।
- সামাজিক বন্ধন: জামাতে নামাজ আদায় করার মাধ্যমে সমাজের মানুষের সাথে পারস্পরিক সম্পর্ক বৃদ্ধি পায়।
- শৃঙ্খলাপরায়ণতা: জামাতে নামাজ আদায় করলে মানুষ সময়ানুবর্তী ও শৃঙ্খলাপরায়ণ হয়।
জোহরের নামাজ কাজা হয়ে গেলে করণীয়
যদি কোনো কারণে জোহরের নামাজ ওয়াক্ত মতো আদায় করা সম্ভব না হয়, তবে তা কাজা আদায় করে নিতে হয়। কাজা নামাজ আদায় করার নিয়ম হলো:
- নিয়ত করা: কাজা নামাজ আদায়ের জন্য প্রথমে নিয়ত করতে হবে। যেমন: “আমি জোহরের কাজা নামাজ আদায় করছি।”
- সাধারণ নিয়মে আদায়: এরপর সাধারণ নিয়মে জোহরের নামাজ আদায় করতে হবে।
- তাড়াতাড়ি আদায় করা: কাজা হয়ে যাওয়া নামাজ যত দ্রুত সম্ভব আদায় করে নেওয়া উচিত।
মহিলাদের জন্য জোহরের নামাজ
মহিলাদের জন্যও জোহরের নামাজ আদায় করা ফরজ। তবে, মহিলারা সাধারণত বাড়িতেই নামাজ আদায় করেন। মহিলাদের নামাজ আদায়ের নিয়ম পুরুষদের মতোই, তবে কিছু ক্ষেত্রে পার্থক্য রয়েছে। যেমন:
- মহিলারা জামাতে নামাজ আদায় না করে একাকী নামাজ আদায় করেন।
- মহিলারা নামাজে হাত বুকের উপর বাঁধেন।
- মহিলারা উচ্চস্বরে কেরাত পড়েন না।
উপসংহার
জোহরের নামাজ মুসলিমদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদত। এই নামাজ আদায় করার মাধ্যমে আল্লাহ্র সন্তুষ্টি লাভ করা যায় এবং অসংখ্য সওয়াব অর্জন করা যায়। তাই, প্রত্যেক মুসলিমের উচিত সময় মতো জোহরের নামাজ আদায় করা এবং এর ফজিলত ও গুরুত্ব সম্পর্কে জানা। আল্লাহ্ আমাদের সবাইকে নিয়মিত নামাজ আদায় করার তাওফিক দান করুন। আমিন।