Namer Ortho Bangla
নামাজ 29 November 2025

এশার নামাজ ১৭ রাকাত: নিয়ম, ওয়াজিব, সুন্নত ও বিস্তারিত

এশার নামাজ ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে অন্যতম। প্রতিদিনকার ব্যস্ত জীবনে অনেক মুসলমানই এশার নামাজ কত রাকাত এবং এর নিয়মকানুন সম্পর্কে জানতে চান। কেউ কেউ মনে করেন এশার নামাজ ১৭ রাকাত, আবার কারো মতে কম বা বেশি। আজকের আর্টিকেলে আমরা এশার নামাজের রাকাত সংখ্যা, নিয়ম, ওয়াজিব, সুন্নত এবং এই সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।

এশার নামাজ কত রাকাত?

এশার নামাজ মোট ১৭ রাকাত। তবে এই রাকাতগুলোর মধ্যে ফরজ, সুন্নত, বিতর ইত্যাদি বিভিন্ন ভাগ রয়েছে। নিচে কোন রাকাতে কী পড়তে হয় এবং রাকাতগুলোর বিভাজন উল্লেখ করা হলো:

  • চার রাকাত সুন্নত (গাইরে মুয়াক্কাদা)
  • চার রাকাত ফরজ
  • দুই রাকাত সুন্নত (মুয়াক্কাদা)
  • দুই রাকাত নফল
  • তিন রাকাত বিতর ওয়াজিব
  • দুই রাকাত নফল

সুতরাং, এশার নামাজে সর্বমোট রাকাত সংখ্যা হলো ৪ + ৪ + ২ + ২ + ৩ + ২ = ১৭ রাকাত।

এশার নামাজের রাকাতসমূহের বিস্তারিত বিবরণ

এশার নামাজের প্রতিটি রাকাতের নিজস্ব নিয়ম ও গুরুত্ব রয়েছে। নিচে প্রত্যেকটি রাকাত সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

চার রাকাত সুন্নত (গাইরে মুয়াক্কাদা)

এশার নামাজের শুরুতে এই চার রাকাত সুন্নত আদায় করা হয়। এটি গাইরে মুয়াক্কাদা সুন্নত, অর্থাৎ এটি আদায় করলে সাওয়াব আছে, কিন্তু ছুটে গেলে কোনো গুনাহ হবে না। এই চার রাকাতে সূরা ফাতিহার পর অন্য যেকোনো সূরা মিলিয়ে পড়া যায়। প্রথম বৈঠকে তাশাহুদ পড়তে হয় এবং শেষ বৈঠকে তাশাহুদ, দরুদ শরীফ ও দোয়া মাসুরা পড়তে হয়।

চার রাকাত ফরজ

এশার নামাজের প্রধান অংশ হলো এই চার রাকাত ফরজ। এটি আদায় করা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য আবশ্যক। এই রাকাতে প্রথম দুই রাকাতে সূরা ফাতিহার পর অন্য একটি সূরা মিলিয়ে পড়তে হয়। শেষ দুই রাকাতে শুধু সূরা ফাতিহা পড়তে হয়। প্রত্যেক বৈঠকে তাশাহুদ পড়তে হয় এবং শেষ বৈঠকে তাশাহুদ, দরুদ শরীফ ও দোয়া মাসুরা পড়তে হয়। জামাতের সাথে ফরজ নামাজ আদায় করা উত্তম।

দুই রাকাত সুন্নত (মুয়াক্কাদা)

ফরজ নামাজের পর এই দুই রাকাত সুন্নত আদায় করা হয়। এটি মুয়াক্কাদা সুন্নত, অর্থাৎ এটি আদায় করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং ছুটে গেলে গুনাহ হতে পারে। এই দুই রাকাতে সূরা ফাতিহার পর অন্য যেকোনো সূরা মিলিয়ে পড়তে হয় এবং প্রত্যেক বৈঠকে তাশাহুদ পড়তে হয় ও শেষ বৈঠকে তাশাহুদ, দরুদ শরীফ ও দোয়া মাসুরা পড়তে হয়।

দুই রাকাত নফল

সুন্নত নামাজের পরে দুই রাকাত নফল নামাজ পড়া হয়। এটি অতিরিক্ত ইবাদত হিসেবে গণ্য করা হয় এবং আদায় করলে অনেক সাওয়াব পাওয়া যায়। নফল নামাজে যেকোনো সূরা পড়া যায় এবং নিজের ইচ্ছানুযায়ী দোয়া করা যায়।

তিন রাকাত বিতর ওয়াজিব

এশার নামাজের শেষ অংশে তিন রাকাত বিতর ওয়াজিব নামাজ আদায় করা হয়। বিতর নামাজ অন্যান্য নামাজের থেকে একটু ভিন্ন। এই তিন রাকাতে সূরা ফাতিহার পর অন্য সূরা মিলিয়ে পড়তে হয়। তৃতীয় রাকাতে রুকুতে যাওয়ার আগে তাকবীরে তাহরিমা বলে হাত তুলে দোয়া কুনুত পড়তে হয়। বিতর নামাজ একা পড়া উত্তম, তবে জামাতের সাথেও পড়া যায়।

দুই রাকাত নফল

বিতর নামাজের পরে আরও দুই রাকাত নফল নামাজ পড়া হয়। এই নামাজ পড়া ঐচ্ছিক, তবে আদায় করলে আল্লাহ তাআলা খুশি হন এবং বান্দার গুনাহ মাফ করেন।

এশার নামাজের নিয়ম

এশার নামাজ পড়ার নিয়ম অন্যান্য নামাজের মতোই। নিচে ধাপগুলো উল্লেখ করা হলো:

  1. নিয়ত করা: প্রথমে মনে মনে এশার নামাজ পড়ার নিয়ত করতে হবে।
  2. তাকবীরে তাহরিমা: এরপর ‘আল্লাহু আকবার’ বলে হাত বাঁধতে হবে।
  3. সানা পড়া: সুবহানাকা আল্লাহুম্মা… শেষ পর্যন্ত পড়তে হবে।
  4. সূরা ফাতিহা ও অন্য সূরা পড়া: প্রথম রাকাতে সূরা ফাতিহার সাথে অন্য একটি সূরা মিলিয়ে পড়তে হবে।
  5. রুকু ও সিজদা: এরপর রুকুতে গিয়ে তাসবিহ পড়তে হবে এবং সিজদায় গিয়েও তাসবিহ পড়তে হবে।
  6. দ্বিতীয় রাকাত: দ্বিতীয় রাকাতে দাঁড়িয়ে সূরা ফাতিহা ও অন্য সূরা মিলিয়ে পড়তে হবে এবং প্রথম রাকাতের মতো রুকু ও সিজদা করতে হবে।
  7. তাশাহুদ পড়া: দ্বিতীয় রাকাতের শেষে তাশাহুদ পড়তে হবে।
  8. তৃতীয় ও চতুর্থ রাকাত: এরপর দাঁড়িয়ে শুধু সূরা ফাতিহা পড়ে রুকু ও সিজদা করতে হবে।
  9. শেষ বৈঠক: শেষ বৈঠকে তাশাহুদ, দরুদ শরীফ ও দোয়া মাসুরা পড়ে সালাম ফিরিয়ে নামাজ শেষ করতে হবে।

এশার নামাজের ওয়াজিবসমূহ

নামাজের ওয়াজিবগুলো হলো সেই কাজগুলো, যা নামাজে অবশ্যই পালন করতে হয়। কোনো ওয়াজিব ছুটে গেলে সাহু সিজদা দিতে হয়। এশার নামাজের কিছু গুরুত্বপূর্ণ ওয়াজিব নিচে উল্লেখ করা হলো:

  • প্রত্যেক রাকাতে সূরা ফাতিহা পড়া।
  • ফরজ নামাজের প্রথম দুই রাকাতে সূরা ফাতিহার সাথে অন্য সূরা মেলানো।
  • রুকু ও সিজদা যথাযথভাবে করা।
  • বৈঠকে তাশাহুদ পড়া।
  • ইমামের জন্য কেরাত আস্তে বা জোরে পড়া (অবস্থাভেদে)।
  • বিতর নামাজে দোয়া কুনুত পড়া।

এশার নামাজের সুন্নতসমূহ

সুন্নত হলো সেই কাজগুলো, যা নবী করিম (সা.) করেছেন এবং যা নামাজের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে। সুন্নত ছুটে গেলে নামাজ বাতিল হয় না, তবে তা পরিহার করা উচিত নয়। এশার নামাজের কিছু সুন্নত নিচে উল্লেখ করা হলো:

  • তাকবীরে তাহরিমার সময় কান পর্যন্ত হাত উঠানো।
  • রুকুতে পিঠ সোজা রাখা।
  • সিজদার সময় নাক ও কপাল মাটিতে লাগানো।
  • দুই সিজদার মাঝে সোজা হয়ে বসা।
  • ডান পায়ের উপর ভর করে বসা এবং বাম পা বিছিয়ে দেওয়া।
  • প্রত্যেক রাকাতে সূরা মিলানোর আগে ‘বিসমিল্লাহ’ পড়া।

এশার নামাজের ফজিলত

এশার নামাজের অনেক ফজিলত রয়েছে। কিছু ফজিলত নিচে উল্লেখ করা হলো:

  • এশার নামাজ জামাতের সাথে আদায় করলে অর্ধেক রাত ইবাদতের সাওয়াব পাওয়া যায়।
  • এশার নামাজ পড়ার মাধ্যমে শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে বাঁচা যায়।
  • এশার নামাজ মুমিন বান্দাদের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ রহমত।
  • নিয়মিত এশার নামাজ আদায় করলে রিজিক বৃদ্ধি পায় এবং শারীরিক ও মানসিক শান্তি লাভ করা যায়।

এশার নামাজ কাজা হয়ে গেলে করণীয়

কোনো কারণে এশার নামাজ সময়মতো আদায় করতে না পারলে, তা কাজা আদায় করে নিতে হয়। কাজা নামাজ পড়ার নিয়ম হলো, যখনই সুযোগ পাওয়া যায়, তখন এশার নামাজের নিয়ত করে ফরজ ও ওয়াজিব আদায় করে নেওয়া। কাজা নামাজ আদায়ে দেরি করা উচিত নয়।

উপসংহার

এশার নামাজ ১৭ রাকাত এবং এর প্রতিটি রাকাতের গুরুত্ব ও তাৎপর্য রয়েছে। সঠিক নিয়মে এবং মনোযোগের সাথে এশার নামাজ আদায় করলে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা যায় এবং জীবনে শান্তি ও সমৃদ্ধি লাভ করা যায়। তাই, প্রত্যেক মুসলমানের উচিত এশার নামাজসহ সকল ওয়াক্তের নামাজ সময়মতো আদায় করা এবং এর ফজিলত সম্পর্কে জানা।