তারাবির নামাজ: চার রাকাত পরপর দোয়া ও নিয়মকানুন
সূচিপত্র
রমজান মাস মুসলিমদের জন্য রহমত ও বরকতের মাস। এই মাসে তারাবির নামাজ আদায় করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদত। তারাবির নামাজে সাধারণত দীর্ঘ কিরাত (কোরআন তেলাওয়াত) করা হয় এবং প্রতি চার রাকাত পর পর কিছু দোয়া ও তাসবিহ পাঠ করার নিয়ম প্রচলিত আছে। এই আর্টিকেলে আমরা তারাবির নামাজের চার রাকাত পরপর দোয়া, এর তাৎপর্য এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
তারাবির নামাজ কি?
তারাবি আরবি শব্দ ‘তারবিহ’ থেকে এসেছে, যার অর্থ বিশ্রাম নেওয়া বা বিরতি দেওয়া। রমজান মাসে এশার নামাজের পর যে নামাজ আদায় করা হয়, তাকে তারাবির নামাজ বলা হয়। এই নামাজে সাধারণত প্রতি দুই রাকাত অথবা চার রাকাত পর পর বিরতি দেওয়া হয় এবং দোয়া ও তাসবিহ পাঠ করা হয়। তারাবির নামাজ সুন্নাতে মুয়াক্কাদা।
তারাবির নামাজের রাকাত সংখ্যা
তারাবির নামাজ ২০ রাকাত পড়া সুন্নত। তবে, কেউ চাইলে এর চেয়ে কমও পড়তে পারে। কিন্তু ২০ রাকাত পড়াই উত্তম। সাহাবায়ে কেরাম এবং তাবেঈনদের আমলও এর সাক্ষ্য দেয়।
তারাবির নামাজ পড়ার নিয়ম
তারাবির নামাজ এশার নামাজের পর বিতর নামাজের আগে আদায় করতে হয়। নিচে তারাবির নামাজ পড়ার নিয়ম আলোচনা করা হলো:
- এশার নামাজের ফরজ ও সুন্নত আদায় করার পর তারাবির নামাজের জন্য দাঁড়ানো।
- প্রত্যেক দুই রাকাত পর পর সালাম ফিরিয়ে নামাজ শেষ করা।
- দুই রাকাত পর পর তাশাহুদ, দরুদ ও দোয়া মাসুরা পড়ে সালাম ফেরানো।
- প্রতি চার রাকাত পর কিছু সময় বিশ্রাম নেওয়া এবং দোয়া ও তাসবিহ পাঠ করা।
- তারাবির নামাজ শেষে বিতর নামাজ আদায় করা।
তারাবির নামাজে চার রাকাত পরপর দোয়া
তারাবির নামাজে চার রাকাত পর পর বিশ্রাম নেওয়ার সময় কিছু দোয়া ও তাসবিহ পড়ার নিয়ম রয়েছে। এই দোয়াগুলো মূলত আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা, রহমত কামনা এবং নিজেদের গুনাহ মাফের জন্য করা হয়। নিচে কয়েকটি প্রচলিত দোয়া উল্লেখ করা হলো:
১. প্রথম দোয়া:
سُبْحَانَ ذِي الْمُلْكِ وَالْمَلَكُوتِ، سُبْحَانَ ذِي الْعِزَّةِ وَالْعَظَمَةِ وَالْهَيْبَةِ وَالْقُدْرَةِ وَالْكِبْرِيَاءِ وَالْجَبَرُوتِ، سُبْحَانَ الْمَلِكِ الْحَيِّ الَّذِي لَا يَنَامُ وَلَا يَمُوتُ، سُبُّوحٌ قُدُّوسٌ رَبُّنَا وَرَبُّ الْمَلَائِكَةِ وَالرُّوحِ، لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ نَسْتَغْفِرُ اللَّهَ، نَسْأَلُكَ الْجَنَّةَ وَنَعُوذُ بِكَ مِنَ النَّارِ
উচ্চারণ: সুবহানা Zil mulki wal malakut, Subhana Zil izzati wal azamati wal haybati wal qudrati wal kibriyai wal jabarut, Subhanal malikil hayyil lazhi la yanamu wa la yamut, Subbuhun Quddusun Rabbuna wa Rabbul malaikati war-ruh, La ilaha illallahu nastaghfirullah, Nas’alukal jannata wa na’udhu bika minan-nar.
অর্থ: পবিত্র সেই সত্তা যিনি সাম্রাজ্য ও ক্ষমতার মালিক। পবিত্র সেই সত্তা যিনি সম্মান, মহত্ত্ব, ভয়, শক্তি, বড়ত্ব ও প্রতাপের মালিক। পবিত্র সেই জীবিত বাদশা যিনি কখনো ঘুমান না এবং মৃত্যু বরণ করেন না। তিনি পরম পবিত্র, তিনি আমাদের রব এবং ফেরেশতা ও রুহের রব। আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই। আমরা আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই। আমরা আপনার কাছে জান্নাত চাই এবং জাহান্নামের আগুন থেকে আশ্রয় চাই।
২. দ্বিতীয় দোয়া:
اَللّٰهُمَّ اِنَّكَ عَفُوٌّ تُحِبُّ الْعَفْوَ فَاعْفُ عَنِّىْ
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউন তুহিব্বুল আফওয়া ফাফু আন্নি।
অর্থ: হে আল্লাহ, নিশ্চয়ই আপনি ক্ষমাশীল, ক্ষমা করতে ভালোবাসেন। অতএব, আমাকে ক্ষমা করুন।
৩. তৃতীয় দোয়া:
এই সময়ে নিজের ভাষায় অথবা অন্য কোনো দোয়াও পড়া যায়। এছাড়া, কুরআন তেলাওয়াত করা, জিকির করা অথবা নফল ইবাদত করা যেতে পারে।
দোয়াগুলোর তাৎপর্য
চার রাকাত পর পর যে দোয়াগুলো পড়া হয়, সেগুলো মূলত আল্লাহর কাছে নিজের দুর্বলতা ও অক্ষমতা স্বীকার করে তাঁর সাহায্য ও ক্ষমা প্রার্থনা করা। রমজান মাসে আল্লাহ তাআলা বান্দাদের প্রতি বিশেষ রহমত বর্ষণ করেন এবং এই সময় দোয়া কবুল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। তাই, এই সুযোগে বেশি বেশি দোয়া করা উচিত।
তারাবির নামাজে ভুলের ক্ষমা
নামাজ পড়ার সময় ভুল হওয়া স্বাভাবিক। যদি কোনো ভুল হয়ে যায়, তবে সাহু সিজদা দেওয়ার মাধ্যমে তা সংশোধন করা যায়। তবে, ভুল যেন না হয়, সেজন্য মনোযোগের সাথে নামাজ পড়া উচিত।
মহিলাদের জন্য তারাবির নামাজ
মহিলারা তাদের নিজ গৃহে তারাবির নামাজ আদায় করতে পারেন। মসজিদে গিয়ে জামাতে নামাজ পড়া তাদের জন্য জরুরি নয়, তবে তারা চাইলে মসজিদে গিয়েও নামাজ আদায় করতে পারেন।
তারাবির নামাজের ফজিলত
তারাবির নামাজ রমজান মাসের বিশেষ একটি ইবাদত। এর ফজিলত অনেক। কিছু ফজিলত নিচে উল্লেখ করা হলো:
- গুনাহ মাফ: তারাবির নামাজ আদায় করার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা বান্দার গুনাহ মাফ করে দেন।
- মর্যাদা বৃদ্ধি: এই নামাজ আদায় করার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে বান্দার মর্যাদা বৃদ্ধি পায়।
- সওয়াব লাভ: তারাবির নামাজ আদায় করলে অনেক সওয়াব পাওয়া যায়।
- আত্মশুদ্ধি: তারাবির নামাজ আত্মশুদ্ধির একটি মাধ্যম।
গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয়
- তারাবির নামাজ জামাতে আদায় করা উত্তম।
- ইমামের সাথে কোরআন তেলাওয়াত শোনা এবং মনোযোগ দেওয়া উচিত।
- নামাজের সময় অন্য কোনো কাজে মনোযোগ দেওয়া উচিত নয়।
- ধীরস্থিরভাবে এবং তারতিলের সাথে নামাজ আদায় করা উচিত।
উপসংহার
তারাবির নামাজ রমজান মাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। এই নামাজে চার রাকাত পর পর দোয়া পড়া এবং বিশ্রাম নেওয়ার মাধ্যমে আমরা আল্লাহর কাছে নিজেদের গুনাহ মাফের জন্য প্রার্থনা করি এবং তাঁর রহমত কামনা করি। তাই, রমজান মাসে তারাবির নামাজ যথাযথভাবে আদায় করার মাধ্যমে আমরা আল্লাহর নৈকট্য লাভ করতে পারি। আল্লাহ আমাদের সবাইকে সঠিকভাবে তারাবির নামাজ আদায় করার তাওফিক দান করুন। আমিন।